জাপানের অভিজ্ঞতা নয়, প্রয়োজন বাংলাদেশের বাস্তবতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কার

জাকির আহমদ খান কামাল

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। শিক্ষার মানোন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে যুগোপযোগী পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন। সম্প্রতি জাপানের অভিজ্ঞতা ও মডেল অনুসরণ করে দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যাপক সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো—শুধু জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগালেই কি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে?

বাস্তবতা হলো, কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তার নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং নাগরিক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। জাপান বিশ্বের অন্যতম শৃঙ্খলাবদ্ধ, দায়িত্বশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর দেশ। সেখানে শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সময়ানুবর্তিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা ছোটবেলা থেকেই চর্চা করানো হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে, খাবার পরিবেশন করে এবং দলগত দায়িত্ব পালন করে। এসব কেবল পাঠ্যক্রমের বিষয় নয়, বরং তাদের সামাজিক সংস্কৃতির অংশ।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে অনেক বিদ্যালয়ে এখনও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষাসামগ্রী এবং মৌলিক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ, আবার কোথাও রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান না করে বিদেশি মডেল অনুকরণ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় সংকট হলো নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক। নতুন কারিকুলাম, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার নানা উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং বাস্তবসম্মত প্রস্তুতির অভাবে অনেক উদ্যোগই বিতর্ক ও বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়। তবে তা অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং প্রয়োজনীয় অংশগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশের শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষা সংস্কারের সফলতা নির্ভর করে বিদেশি মডেলের ওপর নয়, বরং দেশের বাস্তব চাহিদা ও সমস্যার যথার্থ বিশ্লেষণের ওপর। জাপান আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে, কিন্তু সমাধান নয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হলে বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতাকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। তাহলেই শিক্ষা সংস্কার কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত অর্থে জাতি গঠনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

জাকির আহমদ খান কামাল 

কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *