প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি:সকাল ৯টায় স্কুল, বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

সকাল ৯টায় স্কুল, বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

জাকির আহমদ খান কামাল 

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিদিন সকাল ৯টায় হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে উপস্থিতির তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানোর নির্দেশনা তারই একটি অংশ। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। সকাল ৯টায়  শিক্ষক উপস্থিত পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কতটা সহজসাধ্য সে  বিষয়ে কি পরিকল্পনাবিদদের  সুস্পষ্ট ধারণা আছে ? কোনো নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাও সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় এখনও দুর্গম গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। অসংখ্য শিক্ষককে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। যানবাহনে যাতায়াতের পরও কোথাও কোথাও কয়েক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বর্ষাকালে কাদা, জলাবদ্ধতা কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর চাপ শিক্ষকদের জন্য বাড়তি মানসিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক শিক্ষককে সকালবেলার নাস্তা পর্যন্ত বাদ দিয়ে তাড়াহুড়া করে বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়। এতে কর্মদক্ষতা ও মানসিক স্বস্তি—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অবস্থাও ভিন্ন নয়। গ্রামীণ পরিবারের অধিকাংশ শিশু এমন পরিবার থেকে আসে, যেখানে একই পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ কিংবা মাদরাসার সময়সূচি সাধারণত সকাল ১০টার পর শুরু হলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সকাল ৯টার মধ্যে উপস্থিত হতে হয়। ফলে অনেক পরিবারে সকালের খাবার প্রস্তুত হওয়ার আগেই ছোট শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে হয়। এতে অনেক শিক্ষার্থী ক্ষুধার্ত অবস্থায় শ্রেণিকক্ষে বসে থাকে, যা তাদের মনোযোগ ও শেখার সক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজের বড় একটি অংশ নারী। তাঁদের অনেককেই কর্মস্থলে যাওয়ার আগে সন্তান, পরিবার ও বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের দেখাশোনা, রান্নাবান্না ও অন্যান্য পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। সকাল ৯টার মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা তাঁদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে তাঁরা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় মানসিক ক্লান্তির শিকার হন।

প্রশ্ন হলো, শিক্ষার মূল লক্ষ্য কি শুধু সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করা, নাকি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জন্য একটি কার্যকর ও মানবিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা? যদি দ্বিতীয়টিই লক্ষ্য হয়, তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।

সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে শিক্ষার্থীরা নাস্তা বা খাবার খেয়ে বিদ্যালয়ে আসতে পারবে, অভিভাবকদেরও প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকবে। একই সঙ্গে শিক্ষকরা মানসিক চাপমুক্তভাবে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে পাঠদানে অধিক মনোযোগ দিতে পারবেন। এতে উপস্থিতির হার যেমন বাড়বে, তেমনি শিক্ষার গুণগত মানও উন্নত হবে।

অতএব, প্রাথমিক শিক্ষার স্বার্থে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের কল্যাণ বিবেচনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা সময়ের দাবি। বাস্তবতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তই একটি কার্যকর ও টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

জাকির আহমদ খান কামাল 

কলামিস্ট। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *