ধর্ষণ ও বলাৎকারের শিকার শৈশব কলংকিত মানবতা বিবেকের কাঠগড়ায় সমাজ এর শেষ কোথায়?

জাকির আহমদ খান কামাল
শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকারের ঘটনা আজ আমাদের সমাজের অন্যতম ভয়াবহ সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা বলাৎকারের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এসব ঘটনা শুধু একটি শিশুর জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়া দেয়। প্রশ্ন হলো—এই নির্মমতার শেষ কোথায়?
শিশুরা সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকার কথা। অথচ বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতজনদের কাছেও নিরাপদ নয়। অধিকাংশ ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধীরা অপরিচিত কেউ নয়; বরং পরিচিত ও বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিরাই শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। ফলে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকারের পেছনে নানা সামাজিক, নৈতিক ও পারিবারিক কারণ রয়েছে। পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিক শিক্ষার অভাব, মাদকাসক্তি, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং আইনের প্রতি ভয় কমে যাওয়া এসব অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ গোপন করার প্রবণতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় ভোগে। দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তির অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ফলে সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে যে, ভয়াবহ অপরাধ করেও শাস্তি এড়ানো সম্ভব। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
এ সমস্যা মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুদের শরীর সম্পর্কে সচেতনতা, আত্মরক্ষার প্রাথমিক শিক্ষা এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে অভিভাবক বা বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে জানানোর সাহস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সচেতনতামূলক প্রচারণা, সামাজিক আন্দোলন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা সময়ের দাবি। সমাজের প্রতিটি মানুষকে বুঝতে হবে, শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত।
শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়,এটি জাতির নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। এই অমানবিক অপরাধ বন্ধ করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণ প্রয়োজন। একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যতদিন না প্রতিটি শিশু নিরাপদে বেড়ে ওঠার নিশ্চয়তা পাবে, ততদিন আমাদের বিবেকের কাছে এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসবে—শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকারের শেষ কোথায়?
জাকির আহমদ খান কামাল
কলামিস্ট।