যে হাত চক ধরে যে হাত কাপড় মেলে সেই হাতই ভবিষ্যৎ গড়ার হাতিয়ার

জাকির আহমদ খান কামাল 

জনৈক সম্মানিত গুণিজনের সাম্প্রতিক মন্তব্য — “শিক্ষকগণ বিদ্যালয়ে কাপড় শুকান” — শুনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষক স্তম্ভিত হয়েছেন। ব্যঙ্গর ছলে বলা এ বাক্যের পেছনে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে তিনি যে তালিকাটি দেননি, সেটি না জানার কারণেই বোধহয় এমন তাচ্ছিল্য বেরিয়ে এসেছে। 

আসুন, হিসাব মিলিয়ে দেখি বিদ্যালয়ের আঙিনায় আসলে কী কাপড় শুকায়।

প্রথমত, ফুটবল জার্সি। জাতীয় পর্যায়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় গ্রামের একটি শিশু যখন মাঠে নামে, তার গায়ের জার্সিটি বিদ্যালয়েই ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। কারণ অনেক শিক্ষার্থীর বাড়িতে অতিরিক্ত জার্সি কেনার সামর্থ্য নেই। দ্বিতীয়ত, খুদে ডাক্তারদের সাদা এপ্রোন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে খুদে ডাক্তার কার্যক্রমে শিশুরা সহপাঠীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেখে। সেই এপ্রোন পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও বিদ্যালয়ের। 

তৃতীয়ত, হলদে পাখি ও চতুর্থত, কাব দলের পোশাক। সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শিশুদের নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম শেখানো হয় এই দুটি সংগঠনের মাধ্যমে। প্যারেড, সমাবেশ বা স্কাউট জাম্বুরির পর ময়লা হওয়া পোশাক শিক্ষকরাই ধুয়ে পরের দিনের জন্য প্রস্তুত রাখেন। পঞ্চমত, শিশুশ্রেণির রঙিন পর্দা। মনোসামাজিক বিকাশের জন্য শিশু শ্রেণিকক্ষকে ঘরোয়া পরিবেশ দেওয়া হয়। ধুলো জমা পর্দা ধুয়ে শুকিয়ে টানানো শিক্ষকেরই কাজ। 

ষষ্ঠত, শ্রেণিকক্ষের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাপড়। পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয়, পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ স্লোগানের বাস্তবায়ন হয় ঝাড়ু, ন্যাকড়া আর শিক্ষকের তদারকিতে। সপ্তমত, বর্ষার দিনে ভেজা শরীরের কাপড়। গ্রামের কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে, নৌকা বা ভ্যানে চড়ে যে শিক্ষক সময়মতো বিদ্যালয়ে হাজির হন, বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া জামা-কাপড় ক্লাস শুরুর আগেই শুকাতে হয়। নইলে ঠান্ডা-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শিক্ষাদান ব্যাহত হবে। 

অষ্টমত, একটি বাস্তবতা যা অনেকেই জানেন না। বিদ্যালয়ের মাঠ অনেক সময় পাড়ার মানুষের জন্যও উন্মুক্ত। বন্যা বা ঘর সংকটে পাশের বাড়ির মা-বোনেরাও মাঠে কাপড় মেলে দেন। শিক্ষকরা কখনো তা সরিয়ে দেন না, কারণ বিদ্যালয় কেবল ইট-কাঠের ঘর নয়, এটি সমাজের অংশ।

এই আটটি কাপড় আসলে আটটি দায়িত্ব। খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, নেতৃত্ব, সৌন্দর্যবোধ, পরিচ্ছন্নতা, মানবিকতা — পাঠ্যবইয়ের বাইরে শিশুর সার্বিক বিকাশের সব উপাদান এখানে জড়িয়ে আছে। একজন প্রাথমিক শিক্ষক কেবল অ, আ, ক, খ শেখান না। তিনি মিড-ডে মিলের হিসাব রাখেন, উপবৃত্তির ফরম পূরণ করেন, ঝড়ে ভেঙে পড়া বেঞ্চ সারান, আর প্রয়োজনে নিজের ভেজা কাপড়টাও ক্লাসরুমের তারে মেলেন।

তাচ্ছিল্যের আগে বোঝা দরকার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জনবল সংকট তীব্র। একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাজ, উপকরণ তৈরি, অভিভাবক সভা, জরিপ, টিকাদান ক্যাম্প সামলাতে হয়। সহায়ক কর্মচারী না থাকায় অনেক কাজ শিক্ষকদেরই করতে হয়। এটিকে কাপড় শুকানো  বলে উড়িয়ে দিলে, শিক্ষার ভিত্তিটাকেই অস্বীকার করা হয়।

শিক্ষক সমাজ কারও কাছে করুণা চায় না। চায় ন্যূনতম সম্মান ও বাস্তবতা বোঝার মানসিকতা। ভবিষ্যতে মাইক হাতে ‘চিল্লাইয়া’ বক্তব্য দেওয়ার আগে একবার কোনো গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখুন — বারান্দার তারে ঝুলতে থাকা জার্সি, এপ্রোন বা পর্দার পেছনে কতগুলো শিশুর হাসি লুকিয়ে আছে। 

তাচ্ছিল্য নয়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। কারণ যে হাতে চক ধরে, সে হাতেই জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। আর সেই হাত কখনো কখনো কাপড়ও মেলে — শুধু কাপড় শুকানোর জন্য নয়, আগামীর বাংলাদেশকে রোদে শুকিয়ে

 পরিপাটি করার জন্য। 

জাকির আহমদ খান কামাল 

কলামিস্ট। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *