প্রশাসনিক সদিচ্ছা আর নাগরিক সম্প্রীতিই পূর্বধলার উন্নয়নের চাবিকাঠি

জাকির খান কামাল
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান পূর্বধলা সফরে এসে মন্তব্য করেছেন “প্রথম সফরে এসে পূর্বধলাকে এতটা অবহেলিত মনে হয়নি। সামান্য উন্নয়নমূলক কাজ হলেই পূর্বধলা খুব দ্রুত এগিয়ে যাবে।”
তা এই উপজেলার জন্য নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া।—তাঁর এই একটি বাক্য পূর্বধলার গতানুগতিক পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি যে সম্ভাবনার কথা বলেছেন, তা বাস্তবায়নের দায় এখন আমাদের সবার।
তাঁর এই আশাবাদকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান। পূর্বধলা প্রকৃতি, কৃষি, শিক্ষা ও জনসম্পদের দিক থেকে সম্ভাবনাময় একটি উপজেলা। কিন্তু সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধানও কম নয়। যোগাযোগ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, বাজার ও সড়কে দীর্ঘস্থায়ী যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি—এসব সমস্যা স্থানীয় মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। ফলে উন্নয়নের সম্ভাবনা থাকলেও তা প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি।

জেলা প্রশাসকের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে—পূর্বধলার উন্নয়নে বিশাল কোনো অলৌকিক পরিবর্তন নয়, বরং পরিকল্পিত ও সময়োপযোগী কিছু উদ্যোগই যথেষ্ট। এই উপলব্ধিকে সামনে রেখে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই এর মূল লক্ষ্য। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, কর্মসংস্থান, নিরাপদ সড়ক, সুশাসন এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
পূর্বধলা অবহেলিত—এই ধারণা দীর্ঘদিনের। জেলা সদর থেকে দূরত্ব, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও হাওরের প্রান্তিকতা এই জনপদকে পিছিয়ে রেখেছে। পূর্বধলার অভ্যন্তরে বিশেষ করে স্টেশন রোড, গার্লস স্কুল রোডে সামান্য বৃষ্টিতে জলজট পূর্বধলা বাসীর নিত্যদিনের ভোগান্তি। কৃষি ও মৎস্য নির্ভর অর্থনীতি হলেও বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষক ন্যায্য দাম পান না। দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত সমস্যাগুলোর অগ্রাধিকার ভিত্তিক সমাধানের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি আরও বলেন কংশ নদীর তীরবর্তী উর্বর ভূমি, বিস্তীর্ণ হাওর, রেল যোগাযোগ এবং সহজ-সরল মানুষের প্রাণশক্তিই পূর্বধলার সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাঁর ভাষায়, সামান্য উন্নয়নমূলক কাজ হলেই এই উপজেলা দ্রুত এগিয়ে যাবে। এই “সামান্য” কাজগুলো কী?
প্রথমত, অবকাঠামোগত জট খোলা। স্টেশন রোডের যানজট নিরসনে রেললাইনের সমান্তরালে থাকা পরিত্যক্ত কাঁচা রাস্তাটি সংস্কার করে বিকল্প পথ চালু করা এখন সময়ের দাবি। ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে জলজট থেকে পূর্বধলাবাসীকে মুক্ত করা।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। পূর্বধলার রাজধলা বিলসহ অন্যান্য বিলের মাছ সরাসরি ঢাকার বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। রাজধলাবিলসহ কংশনদী কেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে তোলা। কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পে তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণ ও প্রশিক্ষণ সহায়তার মাধ্যমে তাদেরকে আত্মনির্ভরশীল করা।
তৃতীয়ত, সামাজিক পুঁজির ব্যবহার। জেলা প্রশাসক সঠিকভাবেই “সম্প্রীতি ও সহাবস্থান”-এর কথা বলেছেন। পূর্বধলার রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিক—সবাইকে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে একটি টিম হয়ে পূর্বধলায় কাজ করতে হবে। উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা দপ্তরের কাজ নয়, এটি সম্মিলিত প্রয়াস।
জেলা প্রশাসকের এই সফর ও ইতিবাচক মন্তব্য পূর্বধলাবাসীর জন্য একটি বার্তা। বার্তাটি হলো—উচ্চপর্যায়ে পূর্বধলার গুরুত্ব অনুধাবন করা হচ্ছে। এখন প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। উপজেলা প্রশাসন যদি একটি পঞ্চবার্ষিক মাস্টারপ্ল্যান করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্টেশন রোডের বিকল্প রাস্তা, ড্রেনেজ, স্কুল-কলেজে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও কৃষি বাজার সংযোগের কাজ শুরু করেন, তবে “স্বপ্নের উপজেলা” আর স্বপ্ন থাকবে না।
পূর্বধলা অবহেলিত নয়, এটি অপেক্ষমাণ। অপেক্ষা শুধু সঠিক পরিকল্পনা ও সম্মিলিত উদ্যোগের। জেলা প্রশাসকের আস্থা সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাক—এটাই এখন পূর্বধলার সকল মানুষের প্রত্যাশা।
জাকির খান কামাল
কলামিস্ট।