হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠানো এটা হাজিরা নয় নজরদারি

জাকির আহমদ খান কামাল 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার নামে যদি শিক্ষকদের প্রতিদিন ডিজিটাল হাজিরার পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠাতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সেটি কার্যকর প্রশাসনের চেয়ে অবিশ্বাসের সংস্কৃতিকেই বেশি শক্তিশালী করে।

একজন শিক্ষক কেবল অফিসের কর্মচারী নন, তিনি জাতি গঠনের কারিগর। তাঁর পেশাগত মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। প্রতিদিন ছবি তুলে প্রমাণ দিতে হবে যে তিনি কর্মস্থলে উপস্থিত আছেন—এমন ব্যবস্থা শিক্ষকদের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাসের বার্তা বহন করে। এতে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, শিক্ষককে একজন দায়িত্বশীল পেশাজীবী হিসেবে নয়, বরং সার্বক্ষণিক নজরদারির অধীন কর্মী হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার,  উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও অন্যান্য তদারকি কর্মকর্তাদের কাজের পরিধিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। আসলে তাদের কাজ কি? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তিগত বাস্তবতা। দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে ইন্টারনেট সুবিধা নেই। অনেক শিক্ষক এখনও ব্যক্তিগত খরচে মোবাইল ডাটা ব্যবহার করেন। নেটওয়ার্ক সমস্যা, স্মার্টফোনের সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ছবি পাঠাতে বিলম্ব হলে তা অযথা হয়রানির কারণ হতে পারে।

এছাড়া শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন। কিন্তু অতিরিক্ত প্রশাসনিক শর্ত ও প্রমাণ সংগ্রহের চাপ শিক্ষকদের মনোযোগকে মূল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে পারে। একজন শিক্ষক কতবার ছবি পাঠালেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি শ্রেণিকক্ষে কতটা কার্যকরভাবে পাঠদান করছেন।

দুর্নীতি বা অনুপস্থিতি রোধের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু সেই প্রযুক্তি যেন মানবিকতা, পেশাগত মর্যাদা ও পারস্পরিক আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে। শিক্ষকদের সম্মান দিয়ে, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে এবং বাস্তবসম্মত পদ্ধতি গ্রহণ করেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন নজরদারির মাধ্যমে নয়, বরং আস্থা, সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই টেকসই হতে পারে। শিক্ষকদের হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠাতে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত তাই অনেকের কাছেই প্রয়োজনীয় সংস্কারের চেয়ে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

জাকির আহমদ খান কামাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *