উত্তরাঞ্চলে আলুর দামে দরপতন: ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষক

জাকির খান কামাল 

দেশের উত্তরাঞ্চল—রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী ও বগুড়াকে ঘিরে যে বিস্তীর্ণ কৃষিভূমি, তা বহুদিন ধরেই আলু উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। চলতি মৌসুমে ফলন ভালো হলেও বাজারে আলুর দামে আকস্মিক দরপতন প্রান্তিক কৃষকদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই এখন লোকসানের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ছে ১২ থেকে ১৫ টাকা, সেখানে মাঠপর্যায়ে পাইকাররা কিনছেন ৮ থেকে ১০ টাকায়। ফলে প্রতিটি কেজিতেই কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের নিজস্ব হিমাগার সুবিধা নেই, তারা বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করছেন। এতে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

দরপতনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব। উত্তরাঞ্চলে হিমাগার থাকলেও সেগুলোর ধারণক্ষমতা সীমিত এবং ভাড়া তুলনামূলক বেশি। দ্বিতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে আলু কিনে তারা পরে অধিক দামে বাজারজাত করেন, কিন্তু সেই লাভের অংশ কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। তৃতীয়ত, রপ্তানি ব্যবস্থার দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সময়মতো উদ্যোগ ও নীতিগত সহায়তার অভাবে রপ্তানি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না।

প্রশ্ন হলো, ভালো ফলন কি তবে কৃষকের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে? উৎপাদন বাড়লে দাম কমবে—এটি স্বাভাবিক বাজারনীতি। কিন্তু ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা কার্যকর বাজার তদারকি না থাকলে কৃষক চরম ক্ষতির মুখে পড়েন। কৃষি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি; তাই কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সরকার চাইলে কয়েকটি পদক্ষেপ দ্রুত নিতে পারে। প্রথমত, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ ও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে আলু সংগ্রহ। দ্বিতীয়ত, হিমাগার ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা। তৃতীয়ত, আলু প্রক্রিয়াজাত শিল্প—চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্টার্চ ইত্যাদি উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো। এতে উদ্বৃত্ত আলু সংরক্ষণ ও মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে। পাশাপাশি রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দীর্ঘমেয়াদি কৃষি পরিকল্পনা। কোন অঞ্চলে কতটুকু উৎপাদন হবে, বাজার চাহিদা কত, সংরক্ষণ সক্ষমতা কত—এসব সমন্বিত তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা না হলে একই চক্র বারবার ফিরে আসবে। কৃষক যেন ন্যায্য মূল্য পান এবং উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে না ফেলেন, তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

উত্তরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকের চোখের হতাশা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

কৃষি শুধু পণ্য উৎপাদন নয়, এটি লাখো পরিবারের জীবিকা ও আশা-ভরসার

নাম। তাদের বাঁচাতে প্রথম পদক্ষেপই হতে পারে টেকসই কৃষি ও ন্যায়সঙ্গত বাজার ব্যবস্থা কার্যকর।

জাকির খান কামাল 

কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *