হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অভিঘাত

জাকির খান কামাল
বিশ্ব রাজনীতির টানাপোড়েনে মধ্যপ্রাচ্য যখনই অস্থির হয়ে ওঠে, তখনই আলোচনায় আসে হরমুজ প্রণালীর নাম। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থল এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। ফলে কোনো কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বিশ্ব অর্থনীতি কেঁপে ওঠে। আমদানি-নির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ও কৃষি—সবখানেই জ্বালানির ভূমিকা অপরিহার্য। দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমে আসায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তেল, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে প্রথম ধাক্কা আসবে জ্বালানি সরবরাহে। সরাসরি আমদানি ব্যাহত না হলেও বিকল্প রুট ব্যবহারের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে জ্বালানির দামে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি হলে দেশে জ্বালানি ভর্তুকির চাপ বাড়বে কিংবা মূল্য সমন্বয় করতে হবে—দুটোই অর্থনীতির জন্য অস্বস্তিকর।জ্বালানির দাম বাড়লে তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, ফলে মুদ্রাস্ফীতি তীব্র হয়। এমনিতেই বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটে অর্থনীতি চাপের মুখে; তার ওপর জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে রপ্তানি খাত—বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্প—প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বাড়লে শিল্পখাতে লোডশেডিং বা উচ্চ ট্যারিফ—উভয় ঝুঁকিই তৈরি হয়।
অন্যদিকে, প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তেল রপ্তানির আয় কমে গেলে তাদের উন্নয়ন প্রকল্প ও শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান কমে যাওয়া বা প্রবাসী কর্মীদের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও তেলের দাম বেড়ে গেলে রপ্তানিকারক দেশগুলোর আয় সাময়িকভাবে বাড়তেও পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও চাপে পড়বে। উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে বেশি ডলার প্রয়োজন হবে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হলে বাজেট ঘাটতিও বিস্তৃত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় কী? প্রথমত, জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং এলএনজি আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কৌশলগত তেল মজুত বাড়ানো যেতে পারে, যাতে আকস্মিক বৈশ্বিক সংকটে অন্তত স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। তৃতীয়ত, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে। শিল্পখাতে শক্তি দক্ষতা বাড়ানো এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও সহায়ক হতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ঘটনা হয়তো অনিশ্চিত; কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বাস্তবতায় এমন ঝুঁকি অস্বাভাবিক নয়। তাই প্রতিক্রিয়াশীল না হয়ে দূরদর্শী নীতি গ্রহণই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সম্ভাব্য অভিঘাত থেকে রক্ষার প্রধান উপায়।
জাকির খান কামাল
কলামিস্ট
