চাঁদাঅর্থনীতির কবলে বাজার
জাকির খান কামাল

চাঁদা, চাঁদাবাজি ও চাঁদাবাজ—অনিয়ন্ত্রিত দ্রব্যমূল্যের নেপথ্যের অদৃশ্য শক্তি
দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন সাধারণ মানুষের জীবনে এক স্থায়ী চাপ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বাজারে প্রতিদিনই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নতুন করে বাড়ছে, অথচ এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা অনেক সময় পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি কিংবা মুদ্রাস্ফীতি—এসব কারণ আলোচনায় এলেও বাস্তবতার একটি বড় অংশ রয়ে যায় আড়ালে। সেই আড়ালের নাম—চাঁদা, চাঁদাবাজি এবং চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণহীন দৌরাত্ম্য।
পণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি ধাপেই যুক্ত হচ্ছে অবৈধ অর্থ আদায়ের চাপ। কৃষক যখন মাঠ থেকে সবজি বা ফসল বাজারে পাঠান, তখন পরিবহন পথে বিভিন্ন স্থানে দিতে হয় অননুমোদিত টাকা। সড়কের নানা পয়েন্টে গাড়ি থামিয়ে চাঁদা আদায় যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় না; বরং চলে যায় প্রভাবশালী চক্রের হাতে।

ফলে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত এই ব্যয় নিজেরা বহন না করে পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করেন। শেষ পর্যন্ত এর পুরো চাপ এসে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর। অর্থাৎ ক্রেতা বুঝতে না পারলেও তিনি প্রতিদিন চাঁদাবাজির মূল্যই পরিশোধ করছেন।
বাজার ব্যবস্থাপনাও চাঁদাবাজির বাইরে নয়। পাইকারি বাজার থেকে শুরু করে খুচরা দোকান—সব জায়গায় ব্যবসায়ীদের নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। দোকান বসানো, মালামাল ওঠানামা কিংবা নিরাপদে ব্যবসা চালানোর জন্য দিতে হয় তথাকথিত ম্যানেজমেন্ট খরচ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তাদের লাভের বড় অংশই চলে যায় এই অবৈধ ব্যয়ে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম বাড়ান।
চাঁদাবাজি শুধু অতিরিক্ত ব্যয়ই সৃষ্টি করে না; এটি বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাও নষ্ট করে দেয়। সৎ ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে হিমশিম খান, আর অসাধু সিন্ডিকেট চাঁদাবাজদের সঙ্গে সমঝোতা করে বাজার নিয়ন্ত্রণে নেয়। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দ্রব্যমূল্য অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই চাঁদাবাজি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী এটিকে এখন ব্যবসার স্বাভাবিক খরচ হিসেবেই ধরে নিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে এটি অর্থনীতির জন্য এক নীরব বিষ, যা বাজারব্যবস্থা ও আইনের শাসন—উভয়কেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান পরিচালনা বা জরিমানা আরোপ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা। পরিবহন খাত, বাজার কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থাও চালু করা জরুরি।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়,এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠারও প্রশ্ন। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে বাজার কখনোই স্থিতিশীল হবে না। তাই জনগণের স্বস্তির বাজার গড়ে তুলতে হলে আগে ভাঙতে হবে এই অদৃশ্য “চাঁদা অর্থনীতি”র চক্র। কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই পারে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরাতে।
জাকির খান কামাল
কলামিস্ট