হজ হলো ঐক্যের এক অনন্য মহাকাব্য 

জাকির আহমদ খান কামাল 

 সাদা মানুষ, কালো মানুষ, আরব, অনারব, ধনী, দরিদ্র, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, রাজা, প্রজা—পৃথিবীর সব ভেদরেখা যেন এক অপার্থিব দৃশ্যে এসে মিলিত হয় পবিত্র হজের ময়দানে। কেউ লম্বা, কেউ খাটো; কারও দাড়ি আছে, কারও নেই; কেউ ভিন্ন ভাষায় কথা বলে, কেউ ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধি। তবুও বিস্ময়কর এক ঐক্যে সবাই এক হয়ে যায়। কারণ এখানে মানুষের পরিচয় একটাই—সে আল্লাহর বান্দা।

হজ কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানবজাতির সবচেয়ে বড় আত্মিক মিলনমেলা। পৃথিবীর প্রায় ১৮ লক্ষ মানুষ যখন সাদা ইহরামে নিজেদের মুড়িয়ে নেয়, তখন যেন সব অহংকার, সব পরিচয়, সব বৈষয়িক বিভেদ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ইহরামের সেই দুই টুকরো সাদা কাপড় মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—জন্মের সময় যেমন শূন্য হাতে এসেছিলাম, মৃত্যুর পরও তেমনি সাদা কাফনে জড়িয়েই চলে যেতে হবে মহান রবের দরবারে।

চারদিক থেকে যখন ধ্বনিত হয়— “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লাব্বাইকা লা শারিকালাকা লাব্বাইক ইন্নালহামদা ওয়ানিয়ামাতা লাকা ওয়াল মূলক্ লাশারিকালাক” তখন মনে হয়, এ শুধু উচ্চারিত শব্দ নয়; এটি কোটি হৃদয়ের কান্না, ভালোবাসা আর আত্মসমর্পণের সম্মিলিত আর্তনাদ। বান্দা যেন তার রবকে বলছে—“হে আল্লাহ! আমি হাজির। তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে আমি সবকিছু ছেড়ে তোমার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছি।”

হজ আমাদের শেখায়, ইসলামে বর্ণের কোনো অহংকার নেই, জাতের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ায়। আজ মিনার তাঁবু, আরাফাতের ময়দান কিংবা কাবার চত্বর সেই মহান বাণীরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

কিন্তু হজের এই মিলনমেলার মাঝেও লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত বিদায়ের সুর। কারণ প্রতিটি হাজি জানেন না, জীবনে আবার কখনো এই পবিত্র ভূমিতে আসা হবে কি না। কাবার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে অনেক চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। বিদায়ের সেই মুহূর্তে হৃদয় শুধু একটি কথাই বলে—“হে আল্লাহ! আবার ডাক দিয়ো। আবার তোমার ঘরের মেহমান হওয়ার তাওফিক দিয়ো।”

পবিত্র হজ তাই শুধু সফর নয়; এটি আত্মার পরিবর্তন, হৃদয়ের পরিশুদ্ধি এবং মানবজাতির ঐক্যের এক অনন্য মহাকাব্য। এখানে মানুষ হারিয়ে যায়, আর জেগে ওঠে শুধু এক পরিচয়—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)।

জাকির আহমদ খান কামাল 

কলামিস্ট। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *