বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে অঙ্গীকার: হামমুক্ত শিশু অধিকার

জাকির আহমদ খান কামাল
১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ অর্থনীতি ও সমাজ পরিষদ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের সম্মেলন ডাকার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৬ সালের জুন ও জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাংগঠনিক আইন গৃহীত হয়, ১৯৪৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালনের প্রস্তাব দেওয়া হলে তা ১৯৫০ সালে কার্যকর হয়। অর্থাৎ ৭ এপ্রিল ” বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ” বলে নির্ধারিত হয়।
“স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ”প্রতিপাদ্য নিয়ে এ বৎসর পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস।
স্বাস্থ্যই মানবজীবনের মূল ভিত্তি। এ বছর এই দিবস উপলক্ষে হাম বা মিজলস নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকা এই সংক্রামক রোগ আবারও বিশ্বব্যাপী, এমনকি আমাদের দেশেও উদ্বেগজনকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া, পরে শরীরে লাল ফুসকুড়ি—এগুলোই হাম-এর সাধারণ লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতাও সৃষ্টি করতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।

বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ফলে একসময় হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে টিকা গ্রহণে অনীহা, ভুল তথ্যের প্রসার এবং কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে হাম আবারও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, টিকাদানের হার সামান্য কমলেই হাম দ্রুত ফিরে আসতে পারে—কারণ এটি অত্যন্ত সংক্রামক।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকাদান। এমআর (Measles-Rubella) টিকা শিশুদের হাম থেকে সুরক্ষিত রাখে। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) বিনামূল্যে এই টিকা প্রদান করে, যা আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ। তবুও কিছু অভিভাবকের মধ্যে টিকা নিয়ে ভীতি বা বিভ্রান্তি কাজ করে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। মনে রাখতে হবে, টিকা শুধু একটি শিশুকে নয়, পুরো সমাজকে সুরক্ষা দেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত—কোনো শিশুকে টিকার বাইরে রাখা যাবে না। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গ্রাম থেকে শহর—সবখানে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে এবং ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে হবে।
হাম শুধু একটি রোগ নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি সূচকও। আমরা যদি সময়মতো সচেতন হই এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করি, তাহলে এই রোগকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব। অন্যথায় এটি আবারও বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।
সুতরাং, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে হাম নিয়ে আমাদের ভাবনা হওয়া উচিত বাস্তবভিত্তিক ও দায়িত্বশীল। টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা, সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন—এই তিনটি দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে আজকের এই প্রতিজ্ঞাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
জাকির আহমদ খান কামাল
কলামিস্ট।