নিয়ন্ত্রনহীন গতি, অকাল মৃত্যু — কিশোর চালকের বেপরোয়া বাইকই সড়কের নীরব মহামারী

জাকির আহমদ খান কামাল 

সড়ক দুর্ঘটনা আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি এক নীরব মহামারীতে রূপ নিয়েছে। এই মহামারীর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা কিশোর ড্রাইভারদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই লাইসেন্সবিহীন কিশোরদের হাতে দ্রুতগতির বাইক যেন এক বিপজ্জনক খেলনায় পরিণত হয়েছে, যার মূল্য দিতে হচ্ছে মহামূল্যবান প্রাণ দিয়ে।

আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়সের আগে কোনো ব্যক্তি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, স্কুলপড়ুয়া কিংবা কলেজগামী কিশোরদের একটি বড় অংশ নিয়ম ভেঙেই মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। তাদের অনেকেরই নেই সড়ক আইন সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান, নেই পর্যাপ্ত দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা। ফলে অতিরিক্ত গতি, স্টান্টবাজি, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা—এসবই হয়ে উঠছে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

এই সমস্যার পেছনে কেবল কিশোরদের দায় দেখালে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। পরিবারও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। অনেক অভিভাবক সন্তানের আবদার পূরণে কিংবা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দিচ্ছেন। তারা হয়তো ভাবেন, এতে সন্তানের সুবিধা হবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে উঠছে তার জীবনের জন্য হুমকি। সচেতনতার অভাব এবং দায়িত্ববোধের ঘাটতি মিলেই তৈরি করছে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি।

আইন প্রয়োগের দুর্বলতাও একটি বড় কারণ। ট্রাফিক পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব খাটিয়ে বা নানা উপায়ে শাস্তি এড়িয়ে যায় অপরাধীরা। ফলে আইন ভাঙার প্বণতা আরও বেড়ে যায়। কিশোররা বুঝে যায়—ঝুঁকি থাকলেও শাস্তি নিশ্চিত নয়।

বিশেষ করে ঈদ, পুঁজা, বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে , স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার  পার্শবর্তী রাস্তায় এসব  অপ্রাপ্তবয়স্কদের বেপরোয়া বাইক চালাতে দেখা যায়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে কেবল চালক নয়, গাড়ির মালিক বা অভিভাবকের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে, যাতে কিশোররা অল্প বয়স থেকেই দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। তৃতীয়ত, সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। মোটরসাইকেল কোনো খেলনা নয়, এটি একটি দায়িত্বের বিষয়। অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে এটি তুলে দেওয়া মানে তাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।

সড়ক নিরাপদ করতে হলে কিশোর চালকদের এই বেপরোয়া প্রবণতা এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যথায় প্রতিদিনের এই দুর্ঘটনা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করবে—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এখনই সময় সচেতন হওয়ার, এখনই সময় দায়িত্ব নেওয়ার।

জাকির আহমদ খান কামাল 

কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *