খাল খননের নতুন অধ্যায়: শহীদ জিয়ার উদ্যোগ থেকে তারেক রহমানের পুনর্জাগরণ

জাকির খান কামাল
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের জনপদ, কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশ—সবকিছুই নদী ও খালের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একসময় গ্রামবাংলার জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল অসংখ্য খাল-বিল। কিন্তু সময়ের প্রবাহে অনেক খাল ভরাট হয়ে গেছে, অনেকগুলো দখল ও অবহেলায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষি, সেচব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশের ভারসাম্য—সবকিছুতেই দেখা দিয়েছে সংকট। এমন বাস্তবতায় খাল পুনরুদ্ধার ও খননের উদ্যোগ সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে খাল খনন কর্মসূচির একটি স্মরণীয় অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর। সেদিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান উলশী-যদুনাথপুর খাল খননের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির সূচনা করেন। সেই সময় দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল নানা সমস্যায় জর্জরিত। সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে খাল খননকে একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। শহীদ জিয়ার এই উদ্যোগ শুধু একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প ছিল না, এটি ছিল গ্রামীণ উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।

দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে আজ আবার খাল খনন কর্মসূচি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ সাহাপাড়া খাল খননের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন করে এই কর্মসূচির সূচনা করেছেন। অনেকেই এটিকে শহীদ জিয়ার সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। সময় বদলেছে, কিন্তু সমস্যার অনেকটাই একই রয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, সেচের সংকট এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা আজও বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশে খাল শুধু পানি প্রবাহের পথ নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। খাল সচল থাকলে কৃষক সহজে সেচের পানি পায়, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয় এবং মৎস্যসম্পদও সমৃদ্ধ হয়। অন্যদিকে খাল ভরাট হয়ে গেলে বা দখলে চলে গেলে কৃষি ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে খাল পুনঃখনন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি পরিবেশ ও জীবিকার সুরক্ষারও একটি অপরিহার্য উদ্যোগ।
তবে শুধু খাল খননের ঘোষণা দিলেই হবে না, এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, খাল খনন করা হলেও পরে তা আবার দখল বা অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এই উদ্যোগ সফল করতে হলে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা, দখলদারিত্ব রোধ করা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
শহীদ জিয়ার সময় যে দর্শন নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল—গ্রামীণ উন্নয়ন ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন—আজও সেই দর্শন প্রাসঙ্গিক। সাহাপাড়া খাল খননের মাধ্যমে যদি সেই চেতনা আবার জাগ্রত হয়, তবে তা শুধু একটি খাল পুনরুদ্ধার নয়, বরং একটি উন্নয়ন ভাবনার পুনর্জাগরণ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
খাল বাঁচলে জনপদ বাঁচে—এই সত্যটি নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এখনই। আর সেই উপলব্ধি থেকেই যদি খাল পুনরুদ্ধারের আন্দোলন বিস্তৃত হয়, তবে তা দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক ভবিষ্যতের পথ খুলে দিতে পারে।
জাকির খান কামাল
কলামিস্ট