আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার—সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার

জাকির আহমদ খান কামাল 

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার সংগ্রামকে স্মরণ ও নতুন করে অঙ্গীকার করার দিন। এবারের প্রতিপাদ্য— “আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার—সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার”— আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ গ্রহণ করি, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের সমাজ কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমতাপূর্ণ হবে।

নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি টেকসই উন্নয়ন ও একটি সুস্থ সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত। কারণ সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি বৈষম্য, সহিংসতা ও বঞ্চনার শিকার হয়, তবে সেই সমাজ কখনোই পূর্ণ সম্ভাবনায় এগোতে পারে না।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা উদ্যোক্তা খাতে নারীরা নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন। স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদেও নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান। এসব অর্জন নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

তবে অগ্রগতির এই পথ এখনও পুরোপুরি মসৃণ নয়। সমাজের অনেক স্তরে নারী এখনও বৈষম্য, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন। যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানির মতো সমস্যাগুলো নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

এ বাস্তবতায় আজকের পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষায় শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তার কার্যকর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর প্রতি সম্মান ও সমতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ করে কন্যাশিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা, বাল্যবিবাহ রোধ করা এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা ভবিষ্যতের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি। একই সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়ানোও জরুরি, কারণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে।

এই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; সমাজের প্রতিটি মানুষকে এর অংশীদার হতে হবে। পুরুষদেরও নারীর সমঅধিকারের এই সংগ্রামে সহযোগী হতে হবে। কারণ নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই কেবল উদ্‌যাপনের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারেরও দিন। আমাদের আজকের সচেতনতা, নীতি ও পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের মেয়েরা কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজে বড় হবে।

সুতরাং আজকের এই দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত—নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং একটি অবিচল সামাজিক দায়িত্ব। আজকের সঠিক পদক্ষেপই আগামীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। তাই নারী ও কন্যার নিরাপত্তা, সম্মান ও সমঅধিকার নিশ্চিত করেই গড়ে উঠুক একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাপূর্ণ সমাজ। 

জাকির আহমদ খান কামাল 

কলামিস্ট 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *