মিথ্যার স্বাভাবিকতা ও রাষ্ট্রের দুর্বলতা
জাকির আহমদ খান কামাল

মিথ্যার স্বাভাবিকতা হলো যখন মিথ্যাচার সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে, যা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও বিচারিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতার অভাব, দুর্নীতি এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতেই মিথ্যা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এটি রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল করে, জনগণের আস্থা কমায় এবং শেষ পর্যন্ত শাসন কাঠামোতে ভঙ্গুরতা তৈরি করে।
সমাজে যখন মিথ্যা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়, তখন সত্য তার শক্তি হারাতে শুরু করে। সত্যের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থাও তার গভীর প্রভাব অনুভব করে। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তিই হলো আস্থা, সত্যনিষ্ঠতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ। অথচ যখন দায়িত্বহীন অভিযোগ, অপপ্রচার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা রাষ্ট্রের ভিতকে দুর্বল করে দেয়।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি দায়িত্বহীন বক্তব্য ও যাচাইবিহীন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়িয়েছে। অনেক সময় ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা জনপ্রিয়তা অর্জনের উদ্দেশ্যে নানা ধরনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়, যার পেছনে পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকে না। এ ধরনের অভিযোগ যখন বারবার উচ্চারিত হয়, তখন সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং সমাজে অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়।
দায়িত্বহীন অভিযোগের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থায়। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যদি প্রমাণবিহীন অভিযোগ নিয়মিতভাবে ছড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের জন্ম নেয়। এই সন্দেহ ধীরে ধীরে আস্থাহীনতায় রূপ নেয়। আর রাষ্ট্র যখন নাগরিকের আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন তার কার্যকারিতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
একটি দুর্বল রাষ্ট্রের সুযোগ নেয় শক্তিশালী অপরাধী চক্র। যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সত্য প্রতিষ্ঠার কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা জানে, বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের পরিবেশে তাদের অপরাধ আড়াল করা সহজ। ফলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি কিংবা সংগঠিত অপরাধের বিস্তার ঘটতে থাকে।
এখানে অবশ্যই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। গণতান্ত্রিক সমাজে অন্যায় বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা নাগরিকের অধিকার। তবে সেই অভিযোগ হতে হবে দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত। প্রমাণবিহীন অভিযোগ কিংবা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক দায়িত্বের অংশ নয়; বরং তা গণতন্ত্রকেই দুর্বল করে।
এ কারণে প্রয়োজন সত্যকে মূল্য দেওয়ার সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই দায়িত্ব রয়েছে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সত্য প্রতিষ্ঠার পথ আরও শক্তিশালী হয়।
মিথ্যা যদি সমাজে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে সত্য একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে—এটি ইতিহাসেরই শিক্ষা। আর সত্য দুর্বল হয়ে পড়লে রাষ্ট্রও দুর্বল হয়। তাই একটি সুস্থ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে হলে সত্যের মর্যাদা রক্ষা করা এবং দায়িত্বহীন অভিযোগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। সত্যকে শক্তিশালী করাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সমাজকে শক্তিশালী করার একমাত্র পথ।
জাকির আহমদ খান কামাল
কলামিস্ট