পঁচা ডিম-রুটি কাণ্ড: দায়িত্বহীনতায় ঝুঁকিতে শিশুস্বাস্থ্য

জাকির আহমদ খান কামাল
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে চালু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও মানবিক উদ্যোগ। অপুষ্টি দূর করা, উপস্থিতি বাড়ানো এবং ঝরে পড়া রোধ—এই তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখে বহু বছর ধরে কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে
বরগুনা জেলার তালতলীতে স্কুল ফিডিং প্রকল্পের শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাচাঁ কলা, পচাঁ ডিম ও রুটি সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। তাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের হাতে পঁচা ডিম ও রুটি সরবরাহের ঘটনা শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং এটি আমাদের ব্যবস্থাপনা ও তদারকির বড় ধরনের ঘাটতির নগ্নতার বহিরপ্রকাশ।
একটি শিশু যখন বিদ্যালয়ে আসে, তখন তার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সেখানে খাবারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এমন অবহেলা অমার্জনীয়। পঁচা বা নষ্ট খাদ্য শুধু যে শিশুর শারীরিক ক্ষতি করতে পারে তা-ই নয়, এটি তাদের মনে বিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করে। ফলে একটি ইতিবাচক কর্মসূচি উল্টো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যর্থতার দায় কার? সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি, নাকি তদারকির দুর্বলতা—দুটিই এখানে সমানভাবে দায়ী। খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণের কঠোর ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যদি পঁচা খাবার শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যায়, তবে বোঝা যায় কোথাও না কোথাও জবাবদিহির শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। বিদ্যালয় পর্যায়ে গ্রহণের সময় মান যাচাই, উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শন এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং—এই তিন স্তরের সমন্বয় না থাকলে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে।
এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, খাদ্য সরবরাহের আগে ও পরে বাধ্যতামূলক মান যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা সরাসরি তদারকি করতে পারে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য অভিযোগ জানানোর সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে অনিয়ম দ্রুত চিহ্নিত করা যায়।
এছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও সময়ের দাবি। সরবরাহ শৃঙ্খলে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে কোন প্রতিষ্ঠান কখন, কী মানের খাদ্য সরবরাহ করছে তা সহজেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমবে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মনে রাখতে হবে—এই কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে শিশুরা। তাদের সুস্থ বিকাশের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস চলতে পারে না। একটি উন্নত জাতি গঠনের স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন আমাদের শিশুরা নিরাপদ ও পুষ্টিকর পরিবেশে বড় হবে। তাই পঁচা ডিম ও রুটি সরবরাহের মতো ঘটনা যেন আর কখনো না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে এখনই কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
জাকির আহমদ খান কামাল
কলামিস্ট।