সর্বজন শ্রদ্ধেয় হামিদ স্যারের শেষ বিদায়ের আয়নায়—আমাদের দায়িত্ববোধের প্রতিচ্ছবি

একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞানদাতা নন, তিনি একটি সমাজের বিবেক নির্মাতা। পূর্বধলা জগৎমনি সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল হামিদ স্যারের মৃত্যু সেই অর্থেই একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর জানাজা ও শেষ বিদায় ছিল সম্মান, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায় ভরপুর হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই আয়োজনকে ঘিরে যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের সামগ্রিক মূল্যবোধ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
একটি শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের একজন স্বনামধন্য শিক্ষকের শেষ বিদায়—এটি কোনো সাধারণ আয়োজন নয়। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং শিক্ষার্থীদের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অথচ জানা গেছে, জানাজার পূর্ব প্রস্তুতি, স্মৃতিচারণ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। এমনকি অনেককে ডেকে এনে অংশগ্রহণ করাতে হয়েছে—যা স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানান।
সাবেক শিক্ষার্থী ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অসন্তোষ প্রকাশ এটাই প্রমাণ করে যে, বিষয়টি কেবল একটি আয়োজনগত ত্রুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দায়িত্ববোধের প্রশ্নও। আব্দুল হামিদ স্যার শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন গঠনের কারিগর। তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে কোনো ধরনের শৈথিল্য বা অব্যবস্থাপনা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।
অবশ্য বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরে আলম সিদ্দিকীর দুঃখ প্রকাশ একটি ইতিবাচক দিক। তিনি স্বীকার করেছেন যে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটি থাকতে পারে। এই স্বীকারোক্তি ভবিষ্যতের জন্য একটি শিক্ষা হতে পারে, যদি তা থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কারণ ভুল হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়াই প্রকৃত ব্যর্থতা।
এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব বণ্টন এবং সমন্বয়। একটি শক্তিশালী সমন্বয় কমিটি গঠন, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা এবং সময়োপযোগী প্রস্তুতি এমন পরিস্থিতি এড়াতে সহায়ক হতে পারে। একইসঙ্গে, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত থাকলে কাউকে ডেকে আনতে হয় না—মানুষ নিজ থেকেই এগিয়ে আসে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষকের প্রতি সম্মান শুধু তাঁর জীবদ্দশায় সীমাবদ্ধ নয়, মৃত্যুর পর তাঁর বিদায় আয়োজনও সেই সম্মানেরই অংশ। সেখানে কোনো অবহেলা বা বিশৃঙ্খলা মানে আমাদের নিজেদের মূল্যবোধের অবক্ষয়।
আব্দুল হামিদ স্যারের জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর বিদায়ের এই ত্রুটিপূর্ণ আয়োজন যেন ভবিষ্যতে শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়—এটাই প্রত্যাশা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে সেটিই হবে প্রিয় শিক্ষকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
জাকির আহমদ খান কামাল