ঈদ উদযাপনের সেকাল একাল পরিবর্তনের স্রোতে বদলে যাচ্ছে ঐতিহ্যের রূপ

একেএম আজিজুর রহমান
কালের পরিক্রমায় বদলে যায় সমাজ, বদলে যায় মানুষের জীবনযাত্রা। তার সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন আসে প্রিয় উৎসবগুলোতেও। মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদও এর ব্যতিক্রম নয়। এক সময়ের সরল, আন্তরিক ও কাছাকাছি থাকার উৎসব এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নিয়েছে নতুন মাত্রা। গ্রামীণ বাংলার চিরচেনা সেই ঈদ আর শহুরে জীবনের বর্তমান ঈদ—দুই ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের কথায়।
চাঁদ দেখা থেকে ডিজিটাল নির্ভরতা
সেকালের ঈদের চিত্র মনে করে প্রবীণরা আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন। রাজধানীর পুরান ঢাকার বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ শামসুল হক স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় ঈদের চাঁদ দেখার জন্য আমরা দল বেঁধে ছাদে ও মাঠে যেতাম। চাঁদ দেখামাত্রই ‘চাঁদ উঠেছে, চাঁদ উঠেছে’ বলে আনন্দধ্বনি দেওয়া ছিল রীতি। পাড়া-মহল্লায় সেই আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ত। এখন তো আর সেসব নেই। চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণার অপেক্ষায় সবাই চেয়ারে বসে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে।’
আত্মীয়তার বন্ধন বনাম প্রযুক্তির দূরত্ব
এক সময় ঈদ মানেই ছিল আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়ি বেড়িয়ে যাওয়া। কোলাকুলি, সালাম বিনিময় আর একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া ছিল এই দিনের প্রধান অনুষঙ্গ। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন গ্রামের বাড়িতে জড়ো হতেন।

তবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় এখন অনেকটাই ভার্চুয়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তাবাসসুম ইসলাম বলেন, “ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন খুলে দেখি অসংখ্য মেসেজ। সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিয়ে, স্টোরি দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিই ঈদের শুভেচ্ছা। আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়ার চেয়ে বরং বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বেশি পছন্দ করি আমরা।”
কেনাকাটা ও বিনোদনে আমূল বদল
কেনাকাটার ধরনেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এক সময় নতুন জামার জন্য দর্জির কাছে গিয়ে মাপ দিতে হতো, সেলাই হয়ে আসা পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে হতো। এখন অনলাইনে অর্ডার করে বা শপিংমল থেকে তৈরি পোশাক কিনে নেওয়ার চল বেড়েছে।
বিনোদনের ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ষাটোর্ধ্ব সাহিত্যিক আনোয়ারা বেগম বলেন, “আমাদের সময় ঈদের দিন সকালে বের হয়ে পড়তাম। ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে মাটির ব্যাংক, পুতুল কেনা, মাঠে দল বেঁধে খেলাধুলা—এসবই ছিল আমাদের ঈদের আনন্দ। পরবর্তীতে রেডিওতে ঈদের গান আর নাটক শোনার রেওয়াজ চালু হয়। এখন তো দেখি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টিভির রিমোট হাতে বসে থাকতে হয়, কখন কী দেখবে সেই নিয়ে তর্ক লেগে যায়।’
বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে ঈদের বিনোদন মানেই টেলিভিশনের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা, নাটক আর সিনেমা। সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর আগমনে সেই বিনোদনের পরিধি আরও বেড়েছে।
খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য
ইফতার আর ঈদের খাবারেও এসেছে নানামুখী পরিবর্তন। এক সময় ইফতারে ছিল পিঠা, চিড়া-কলার মতো সহজ সরল আয়োজন। এখন ইফতারে দেখা মেলে বাহারি সব খাবারের। বিভিন্ন দেশের খাবার থেকে শুরু করে ফিউশন ফুড—সবই এখন ইফতার টেবিলে স্থান পায়। শুধু খাওয়াই নয়, খাবারের ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করাও এখন অনেকের কাছে ঈদ উদযাপনেরই অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য
একান্নবর্তী পরিবারের সেই জমজমাট ঈদ এখন অনেকটাই ইতিহাস। কর্মসূত্রে পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় সবাই একসঙ্গে হওয়ার সেই আনন্দ দিনে দিনে কমে আসছে। গ্রামে-গঞ্জে এখনও কিছুটা সেই ঐতিহ্য টিকে থাকলেও শহুরে জীবনে তা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
সমাজবিজ্ঞানী ড. মোশাররফ হোসেন মনে করেন, “প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি অনেক ঐতিহ্যকেও গ্রাস করছে। তবে ঈদের মূল চেতনা—আনন্দ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ—অটুট থাকলে উদযাপনের পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আসাটাই স্বাভাবিক।”
সময়ের সাথে সাথে উদযাপনের মাধ্যম বদলে গেলেও, ঈদের দিনে শিশুদের চোখে-মুখে যে আনন্দের ঝিলিক ফোটে, বড়দের কণ্ঠে যে ‘ঈদ মোবারক’ ধ্বনি ওঠে, আত্মীয়তার বন্ধনে যে টান অনুভূত হয়—তা হয়তো চিরকাল একই থাকবে।বিচ্ছিন্ন মানুষের নিঃশব্দ ঈদ সবার জন্য সমান আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে না।
এই উৎসবের উজ্জ্বল আলোয়ের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে কিছু মানুষের নীরব কষ্ট, অপ্রকাশিত বেদনা।
জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় কিংবা বন্যায় ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই হয়ে পড়েছেন উদ্বাস্তু। নিজের ঘর, নিজের মানুষ, নিজের শেকড়—সবকিছু হারিয়ে তারা আজ নতুন কোনো অচেনা শহরে, অচেনা জীবনে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ঈদের দিন যখন চারপাশে আনন্দের রঙ ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই মানুষগুলোর মনে জেগে ওঠে হারিয়ে যাওয়া সেই বাড়ির কথা—
যেখানে একসময় পরিবারকে ঘিরেই ছিল তাদের ঈদ।ভাঙা পরিবার, ভাঙা উৎসব
শুধু প্রকৃতিই নয়, জীবনের নানা টানাপোড়েনও মানুষকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পারিবারিক কলহ, স্ত্রী সন্তানের বৌরী মনোভাব , অর্থনৈতিক সংকট কিংবা সম্পর্কের ভাঙন—অনেককেই ঠেলে দেয় একাকীত্বের দিকে। কেউ হয়তো একই শহরে থেকেও আলাদা হয়ে গেছে, কেউ বা অভিমান বুকে নিয়ে বছরের পর বছর দূরে। ঈদের দিন সেই দূরত্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফোনে একটি ‘ঈদ মোবারক’ বার্তা এলেও, সেই সম্পর্কের উষ্ণতা আর ফিরে আসে না। সমাজের প্রান্তে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো সমাজের এক প্রান্তে এমন অনেক মানুষ আছেন—যাদের কাছে ঈদ মানেই আরেকটি সাধারণ দিন।পথশিশু, আশ্রয়হীন মানুষ, কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কেউ—
তাদের জীবনে ঈদের আনন্দ খুব কমই পৌঁছায়।নতুন জামা, ভালো খাবার, কিংবা একসঙ্গে নামাজ পড়ার আনন্দ—
এসব তাদের কাছে প্রায়ই অধরা থেকে যায় তবুও তারা হয়তো দূর থেকে দেখে—
মানুষের হাসি, আলোকসজ্জা, আনন্দের ঢেউ…আর নিঃশব্দে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
একেএম আজিজুর রহমান
শিশু উন্নয়ন কর্মী ও
কলাম লেখক