বিশ্বব্যাপী সংঘাতে শিশু হত্যার মানবিক বিপর্যয়

একেএম আজিজুর রহমান 

যুদ্ধ এবং সংঘাতের ইতিহাস রক্তে লেখা, কিন্তু তার মধ্যে সবচেয়ে কালো অধ্যায়টি লেখা হয় শিশুদের জীবন দিয়ে। শিশু হত্যা কেবল একটি আইনগত অপরাধ নয়; এটি মানবতার চরম অবমাননা, যা একটি পরিবারকে তো বটেই, পুরো সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা আমাদের আবারও এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

ইরান: মিনাবের স্কুলে নেমেছিল মৃত্যু

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটি ইরানের মিনাব শহরের জন্য শোকের বার্তা নিয়ে আসে। শহরের Shajareh Tayyebeh প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচালিত এক বিমান হামলায় প্রায় ১৬৮ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়। নিহতদের অধিকাংশই ছিল ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়ে শিশু। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘনের এই উদাহরণটিকে UNICEF এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেছে।

গাজা: টানা সংঘাতে হারানো শৈশব

গাজার উপত্যকা যেন শিশুদের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নের নাম। অবিরাম বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসের ফলে অসংখ্য শিশু প্রাণ হারিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে টেল আল-হাওয়া এলাকায় পাঁচ বছর বয়সী হিন্দ রাজাবের মৃত্যু এই দুঃস্বপ্নেরই একটি অংশ। এই ধরনের হামলা শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা – সবকিছুই কেড়ে নিচ্ছে।

ইউক্রেন: বেসামরিক এলাকায় থামেনি অশ্রু

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ময়দানেও শিশুরা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। খারকিভ শহরের সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত দুই শিশু নিহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে যুদ্ধের দামামা যেখানেই বাজে, সেখানেই শিশুরাই প্রথম ও প্রধান বলি হয়।

বিশ্বব্যাপী ক্ষত: সিরিয়া থেকে ইয়েমেন

শুধু ইরান, গাজা বা ইউক্রেন নয়; লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলেও সংঘাতের আগুনে শিশুরা পুড়ে মরছে। সম্প্রতি লেবাননে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে ৮৩ শিশু নিহত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, যুদ্ধের সময় শিশুদের জীবন সর্বত্রই চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

আন্তর্জাতিক আইন কি নীরব?

জেনেভা কনভেনশন এবং Convention on the Rights of the Child (CRC)-এর মতো আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্টভাবে শিশুদের যেকোনো সশস্ত্র হামলা থেকে রক্ষার নির্দেশ দেয়। স্কুল ও হাসপাতাল নিরাপদ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। UNICEF ও জাতিসংঘ বারবার বিশ্ব সম্প্রদায়কে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে এলেও, বাস্তবতা দিন দিন অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: এক বিষাদের ছায়া

যুদ্ধ ও সংঘাতে শিশু হত্যার প্রভাব তাৎক্ষণিক মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যারা বেঁচে থাকে, তারা:

· পরিবার হারিয়ে এতিম হয়ে পড়ে।

· শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভবিষ্যৎ থেকে বঞ্চিত হয়।

· মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে গভীর মানসিক আঘাত নিয়ে বেঁচে থাকে।

· দারিদ্র্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তার চক্রে আবর্তিত হয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রতিটি সংঘাত আমাদের শিক্ষা দেয়, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী এই শিশুরা। তাদের শৈশব কেড়ে নেওয়া মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেড়ে নেওয়া।

একটি সত্যিকারের মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে হলে শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। শিশু হত্যার প্রতিটি ঘটনা প্রতিরোধ করা এবং সংঘাত নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া শুধু নৈতিক নয়, বরং টিকে থাকারও কর্তব্য। কারণ শিশুরাই একমাত্র সেতু, যা আমাদের বর্তমানকে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক ভবিষ্যতের সাথে সংযুক্ত করে। তাদের সুরক্ষাই মানবতার সুরক্ষা।

একেএম আজিজুর রহমান 

শিশু উন্নয়ন কর্মী ও কলাম লেখক 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *