বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট

একেএম আজিজুর রহমান
বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা অনেক সময় দূরের কোনো দেশকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা বা সংঘাত তার একটি বড় উদাহরণ। বহুমাত্রিক সংকটের উপাদানের প্রবাসী রেমিটেন্স , প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও জ্বালানি সংকট উল্লেখযোগ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে দৃশ্যমান হচ্ছ।
এই অঞ্চলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় যে কোনো যুদ্ধ বা রাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাসের বাজারকে অস্থির করে তোলে। এর প্রভাব পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপর, বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ সেই দেশগুলোর অন্যতম।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। দেশের ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দেশীয় জ্বালানি সম্পদ দিয়ে পুরো চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তেল, কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানির উপর নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। এই আমদানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসে, যার পরিবহন পথ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী।
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও দেশীয় উৎপাদন প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশ বিদেশ থেকে LNG আমদানি করছে। প্রধানত কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এই গ্যাস আনা হয়। এছাড়া স্পট মার্কেট থেকেও মাঝে মাঝে LNG ক্রয় করা হয়।
তেলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (BPC) প্রতি বছর প্রায় ৬–৭ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। এর একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো—যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে। এই তেল বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প ও কৃষিখাতে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কিছু পরিমাণ কয়লাও আমদানি করা হয়, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে।
এই আমদানিকৃত জ্বালানির একটি বড় অংশ পরিবহন করা হয় পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এটি ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এবং পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন পরিবাহিত হয়।
ফলে হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাত দেখা দিলে তা সরাসরি বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করে। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে এই প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। যদি কোনো কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় বা পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
এছাড়াও জ্বালানি সরবরাহে বিলম্ব বা অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন এবং পরিবহন খাতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানোই হতে পারে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম পথ।সাম্প্রতিক সময়ের জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকার
কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে আমরা পত্রপত্রিকায় লক্ষ্য করছি।
একেএম আজিজুর রহমান
শিশু উন্নয়ন কর্মী ও
কলাম লেখক