রাজধানীতে “নারী বাস সার্ভিস”ভোগান্তি কমবে, না বিরম্বনা বাড়বে?

জাকির খান কামাল 

রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বিশৃঙ্খলা, ভিড়, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিয়মের এক জটিল চিত্র বহন করে আসছে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী ও গৃহিণীদের জন্য বাসে যাতায়াত অনেক সময় হয়ে ওঠে মানসিক চাপ ও শারীরিক ঝুঁকির কারণ। এই প্রেক্ষাপটে “নারী বাস সার্ভিস” চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ভাবনা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এ উদ্যোগ কি সত্যিই নারীদের ভোগান্তি কমাবে, নাকি নতুন ধরনের বিরম্বনার জন্ম দেবে?

প্রথমত, নারী বাস সার্ভিসের মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে নারীদের ভ্রমণ নিশ্চিত করা। গণপরিবহনে ইভটিজিং, অশালীন আচরণ ও ভিড়ের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের অভিযোগ নতুন নয়। আলাদা বাস সার্ভিস নারীদের জন্য একটি নির্ভার যাত্রা নিশ্চিত করতে পারে—যেখানে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন। বিশেষ করে পিক আওয়ারে নারী যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট বাস থাকলে মানসিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।

তবে বাস্তবতার নিরিখে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। ঢাকার সড়কে যেখানে বিদ্যমান বাসসংখ্যাই চাহিদার তুলনায় কম, সেখানে আলাদা নারী বাস চালু করলে কি সাধারণ বাসের ওপর চাপ আরও বাড়বে না? যদি নারী বাসের সংখ্যা পর্যাপ্ত না হয়, তবে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সময় নষ্টের নতুন ভোগান্তি সৃষ্টি হতে পারে। অনেক নারীই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অফিসে পৌঁছাতে বাধ্য, সেক্ষেত্রে নারী বাসের জন্য অপেক্ষা করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, এ উদ্যোগে লিঙ্গভিত্তিক আলাদা ব্যবস্থা তৈরি হওয়ায় সমতার প্রশ্নও উঠতে পারে। নিরাপত্তাহীনতার সমাধান হিসেবে আলাদা বাস চালু করা মানে কি মূল সমস্যাকে স্বীকার করে নিয়ে তার স্থায়ী সমাধান না খোঁজা? প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন ছিল সব বাসে কঠোর নজরদারি, সিসিটিভি, শাস্তির নিশ্চয়তা ও সচেতনতা বৃদ্ধি। নারী বাস যদি মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধানকে আড়াল করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।

অন্যদিকে, সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় নারী বাস সার্ভিস সফলও হতে পারে। নির্দিষ্ট রুট, নির্ধারিত সময়সূচি, প্রশিক্ষিত নারী স্টাফ ও কার্যকর মনিটরিং থাকলে এটি নগর পরিবহনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। পাশাপাশি সাধারণ বাস সার্ভিসেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। নারী বাস কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; এটি হতে হবে সমন্বিত পরিবহন সংস্কারের অংশ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নারী বাস যেন প্রতীকী উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না থাকে। এটি যদি কেবল প্রচারণামূলক প্রকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে ভোগান্তি কমার বদলে বিরম্বনাই বাড়বে। কিন্তু যদি আন্তরিকতা, পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ থাকে, তবে এটি হতে পারে নারীবান্ধব নগর গঠনের এক বাস্তব পদক্ষেপ।

অতএব, নারী বাস সার্ভিস সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। সঠিক প্রয়োগে এটি ভোগান্তি কমাতে পারে, ভুল ব্যবস্থাপনায় বাড়াতে পারে নতুন জটিলতা। এখন দেখার বিষয়—নীতিনির্ধারকরা কোন পথে হাঁটেন।

জাকির খান কামাল 

কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *