শিশু তাবাসসুমের বস্তাভর্তি লাশ: বিচার, নিরাপত্তা ও সমাজের কঠিন বাস্তবতা
জাকির খান কামাল

শিশু তাবাসসুমের বস্তাভর্তি লাশ
উদ্ধারের ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজ, বিচারব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর গভীর সংকটকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। এমন নির্মম ঘটনার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—অপরাধীরা দ্রুত শনাক্ত হবে, গ্রেপ্তার হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। বাস্তবতা হলো, পুলিশ সাধারণত দিন-রাত পরিশ্রম করেই অপরাধীকে খুঁজে বের করে। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার পর গল্পটি প্রায়ই অন্যদিকে মোড় নেয়।
অপরাধী গ্রেপ্তারের পর একটি অদৃশ্য সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়। যে পুলিশ সদস্য জীবনঝুঁকি নিয়ে অপরাধীকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করেন, অনেক সময় সেই তিনিই অভিযুক্তের ব্যক্তিগত শত্রুতে পরিণত হন। অপরাধীর দৃষ্টিতে পুলিশ আর রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নয়; বরং তার স্বাধীনতা হরণের জন্য দায়ী ব্যক্তি। প্রতিশোধস্পৃহা তখন নীরবে জন্ম নেয়—সুযোগ পেলেই ক্ষতি করার মানসিকতা তৈরি হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বিপজ্জনক সামাজিক প্রবণতা—পুলিশকে ঘিরে সন্দেহ ও গুজবের সংস্কৃতি। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি বা তার স্বজনরা সহজেই প্রচার করে, “পুলিশ টাকা চেয়েছিল”, “টাকা না দেওয়ায় ফাঁসানো হয়েছে।” সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই এসব বক্তব্য সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং প্রকৃত তদন্তও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে একদিকে যেমন বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হয়, অন্যদিকে দায়িত্বশীল পুলিশ সদস্যদের মনোবলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় আরেকটি বাস্তবতা হলো দীর্ঘসূত্রতা ও আপসের সংস্কৃতি। অনেক ক্ষেত্রে আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মধ্যে সাক্ষী দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রমাণ নষ্ট হয় অথবা ভিকটিমের পরিবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপে আপস করতে বাধ্য হয়। কখনো আর্থিক সমঝোতায় মামলা প্রত্যাহার হয়ে যায়। তখন আইনের চোখে মামলা শেষ হলেও ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি ঝুলে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকেন তদন্তকারী পুলিশ সদস্যরা। অপরাধী জামিনে বের হলে বা মামলা দুর্বল হয়ে গেলে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। অথচ সমাজ খুব কমই তাদের এই মানবিক ঝুঁকির দিকটি বিবেচনা করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও যে পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের মানুষ—এই সত্যটি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।
তাই কেবল অপরাধী গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া। তদন্তের মান উন্নয়ন, সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুজব প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ—এসব এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি সমাজকেও দায়িত্বশীল হতে হবে; যাচাইহীন অভিযোগ বা গুজব ছড়িয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা শেষ পর্যন্ত অপরাধীদেরই সুবিধা দেয়।
শিশু তাবাসসুমের হত্যাকাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়, এটি একটি সামাজিক প্রতিশ্রুতি। অপরাধীর শাস্তি যেমন জরুরি, তেমনি যারা আইনের পক্ষে দাঁড়ায় তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় বিচার প্রতিষ্ঠার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে, আর সমাজ বারবার একই দুঃখজনক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখবে।
জাকির খান কামাল
কলামিস্ট