অনৈতিক আকাশ সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধে দরকার জরুরি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
জাকির খান কামাল

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তির প্রসার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নতুন দুয়ারও খুলে দিয়েছে। স্যাটেলাইট টেলিভিশন, অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবভিত্তিক কনটেন্টের মাধ্যমে বিশ্বসংস্কৃতি এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই অবাধ প্রবাহের মধ্য দিয়ে এমন কিছু বিষয়ও প্রবেশ করছে, যা আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে অনেকেই অনৈতিক আকাশ সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
বিদেশি বিনোদনমূলক কনটেন্টের মধ্যে অতিরিক্ত ভোগবাদ, অশালীনতা, পারিবারিক মূল্যবোধবিরোধী আচরণ, সহিংসতা ও বিকৃত জীবনধারার প্রচার তরুণ সমাজের চিন্তা ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলছে। এর ফলে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে, ভাষা বিকৃতি বাড়ছে, এবং ঐতিহ্যবাহী সামাজিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিশু ও কিশোররা দ্রুত অনুকরণপ্রবণ হওয়ায় এই প্রভাব আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, লোকজ ঐতিহ্য ও পারিবারিক মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বিদেশি ধারাবাহিক, অশালীন ভিডিও কনটেন্ট ও অপ্রাসঙ্গিক বিনোদনের প্রভাবে এই সাংস্কৃতিক ভিত্তি ক্রমশ ক্ষয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, সম্প্রচার নীতিমালা শক্তিশালী করে অশালীন ও সমাজবিরোধী কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি কনটেন্ট সম্প্রচারের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা ও নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। তৃতীয়ত, দেশীয় সংস্কৃতি, নাটক, চলচ্চিত্র ও শিক্ষামূলক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান তৈরিতে প্রণোদনা ও অর্থায়ন বাড়াতে হবে। চতুর্থত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশু ও কিশোরদের জন্য নিরাপদ কনটেন্ট পরিবেশ নিশ্চিত করতে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
তবে শুধু সরকারি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের সঠিক মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া, দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে নৈতিক নির্দেশনা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বসংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্থ সাংস্কৃতিক বিনিময় নিশ্চিত করা এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক শক্তিকে দৃঢ় করা। সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষা করা মানে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা নয়; বরং এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
অতএব, অনৈতিক আকাশ সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।
জাকির খান কামাল
কলামিস্ট