ভাষা শিক্ষায় দুর্বলতা প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কাঠামোগত সংকট

জাকির খান কামাল 

মাতৃভাষা ও ইংরেজি—উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ঘাটতি আজ দৃশ্যমান। ফলে তারা শুধু পরীক্ষায় নম্বর পেতে মুখস্থ নির্ভর হয়ে পড়ছে, বরং ভাব প্রকাশ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং জ্ঞানচর্চার মৌলিক ভিত্তিতেই দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে। এই সংকট ব্যক্তি নয়, সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্গত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।

প্রাথমিক স্তরে ভাষা শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই পড়তে পারে, অথচ অনুধাবন করতে পারে না। শব্দার্থ বোঝা, বাক্য গঠন, নিজের ভাষায় ভাব প্রকাশ—এসব দক্ষতা পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠে না। এর পেছনে রয়েছে বড় ক্লাসরুম, শিক্ষক সংকট, মুখস্থভিত্তিক মূল্যায়ন এবং ভাষা শেখার আনন্দময় পদ্ধতির অভাব। শিশুর ভাষা শেখার প্রক্রিয়ায় গল্প, আলোচনা ও সৃজনশীল চর্চা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো প্রায় অনুপস্থিত।

মাধ্যমিক স্তরে সমস্যা আরও প্রকট হয়। শিক্ষার্থীরা ব্যাকরণ মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেও বাস্তব প্রয়োগে দুর্বল থাকে। বাংলা ভাষায় শুদ্ধভাবে লিখতে ও বলতে না পারা এবং ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতার অভাব তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতি ভাষাকে জীবন্ত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে না দেখে কেবল একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে, যা দক্ষতা উন্নয়নের পথে বড় বাধা।

উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে এসে এই দুর্বলতার বহুমাত্রিক প্রভাব দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণা প্রবন্ধ লেখা, উপস্থাপনা করা বা একাডেমিক ভাষায় মত প্রকাশে হিমশিম খায়। আন্তর্জাতিক জ্ঞানভান্ডারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতার অভাব তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। ফলে কর্মক্ষেত্রেও যোগাযোগ দক্ষতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই সংকটের মূল কারণগুলো কাঠামোগত। পাঠ্যক্রমে ভাষা শিক্ষার লক্ষ্য দক্ষতা উন্নয়ন নয়, বরং পরীক্ষায় সাফল্য। শিক্ষক প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীসংখ্যার আধিক্য, গ্রন্থাগার ও পাঠাভ্যাসের অভাব এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না থাকা সমস্যাকে জটিল করেছে। পরিবার ও সমাজেও পাঠচর্চার পরিবেশ কমে যাওয়ায় শিশুদের ভাষাগত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সমাধানের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রাথমিক স্তর থেকেই আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক ভাষা শিক্ষা চালু করতে হবে। মুখস্থ নির্ভর মূল্যায়নের পরিবর্তে অনুধাবন ও প্রকাশ দক্ষতা যাচাই করতে হবে। শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে পাঠচক্র ও আলোচনাভিত্তিক শিক্ষা, গ্রন্থাগার ব্যবহারের সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রীর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সভ্যতার ভিত্তি। তাই ভাষা শিক্ষায় কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এখন সময়ের দাবি। শক্তিশালী ভাষা দক্ষতা গড়ে তুলতে পারলে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে ।

জাকির খান কামাল 

কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *