শীতল পাটির শীতল পরশ
  1. [email protected] : জাহিদ হাসান দিপু : জাহিদ হাসান দিপু
  2. [email protected] : মোঃ জিলহজ্জ হাওলাদার, খুলনা : মোঃ জিলহজ্জ হাওলাদার, খুলনা
  3. [email protected] : বার্তা ডেস্ক : বার্তা ডেস্ক
  4. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  5. [email protected] : দৈনিক নোঙর ডেস্ক : দৈনিক নোঙর ডেস্ক
  6. [email protected] : দৈনিক নোঙর ডেস্ক : দৈনিক নোঙর ডেস্ক
  7. [email protected] : Shaila Sultana : Shaila Sultana
  8. [email protected] : দৈনিক নোঙর ডেস্ক : দৈনিক নোঙর ডেস্ক
  9. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  10. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  11. [email protected] : Sobuj Ali : Sobuj Ali
শীতল পাটির শীতল পরশ
সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন

শীতল পাটির শীতল পরশ

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১ জুন, ২০২১
  • ৭৫ জন পড়েছেন

শীতল পাটি বাংলার সুপ্রাচীন এক কুটির শিল্পের নাম। শীতল পাটি আমাদের সভ্যতা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের অংশ। এছাড়া বাংলাদেশের শীতল পাটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যেরও অংশ। জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিক এ স্বীকৃতি ঘোষণা দেয়।

এক সময় সারাবিশ্বে ছিল শীতল পাটির খ্যাতি। আমাদের গৃহস্থালির নানা দরকারি জিনিসের মধ্যে বিশেষ স্থানজুড়ে আছে এ পাটি। গরমের সময় এ শীতল পাটির ঠাণ্ড পরশে শান্তি ও ক্লান্তি দূর করে। মানুষের জীবনযাত্রার এক অনন্য অনুষঙ্গ হচ্ছে শীতল পাটি। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার এ যুগে এসেও পাটির চাহিদা এতটুকু কমেনি।
 
শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠে বর্ণিল ফুল, ফল, পশুপাখি প্রিয়জনের অবয়ব এমনকি জ্যামিতিক গাণিতিক নকশাও। শীতল পাটির নকশায় জায়নামাজে ব্যবহৃত হয়েছে মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এ শীতল পাটিকে ঘিরে যুগে যুগে কত গান, কত কাব্য রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।

“আসুক আসুক মেয়ের জামাই, কিছু চিন্তা নাইরে, আমার দরজায় বিছাই থুইছি , কামরাঙা পাটি নারে” পল্লীকবি জসিমউদদীন তাঁর নকশীকাঁথার মাঠ কাব্যগ্রন্থে কামরাঙা নামক শীতল পাটির বর্ণনা এভাবেই দিয়েছেন। আগের দিনে যখন বিদ্যুৎ ছিল না, তখন কাঁথা বা তোশকের ওপর মিহি বেতের নকশি করা এক ধরনের পাটি ব্যবহার হতো। তাতে গা এলিয়ে দিলে শরীর বা মনে শীতল পরশ অনুভূত হতো। তাই বোধহয় নাম দেওয়া হয়েছিল শীতল পাটি। শীতল পরশের পাশাপাশি বর্ণিল নকশা সবাইকে মুগ্ধ করে।

শীতল পাটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী গৃহায়নের কারুশিল্প। দেশে পাটিপাতা চাষ পরিবেশবান্ধব, জলবায়ু সহায়ক। এই খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ ও পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘শীতল পাটি উন্নয়ন অভিযান-২০১৯’ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। যার প্রতিপাদ্য বিশ্ব জলবায়ু সহায়ক শীতল পাটি ট্যাক্সবিহীন রপ্তানির সুযোগ চাই। উন্মুক্ত প্রশিক্ষণ, উৎপাদন, বিপণন ও সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রদান লক্ষ্য স্থির হয়েছে এ কার্যক্রমের মাধ্যমে।

জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনে ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের শীতল পাটি বুননের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্বের দরবারে সম্মান সূচক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

আমাদের দেশে পাটির রয়েছে নানা ধরনের নাম ও ব্যবহার। শুধু শয্যা বা বসার জন্য নয়; বিদ্যুতের পাখার অবর্তমানে অতীতে জমিদার বাড়ি ও সরকারি অফিস আদালতে শীতল পাটির মাদুর দিয়ে টানা পাখার ব্যবহার ছিল। আজকাল এ শীতল পাটি শুধু বিছানায় ব্যবহার হয় না, বরং রুচিসম্মত সাজসজ্জার উপকরণ, বাতির জন্য শেড, কার্পেটের বদলে নকশী মাদুর, খাওয়ার টেবিলে ছোট আকারের নকশী ম্যাট, চশমার খাপ, সুকেস, ব্যাগ, দেয়াল হ্যাঙ্গার ইত্যাদিতে শীতল পাটির বহুল চাহিদা রয়েছে। ফলে শীতল পাটি বহুদিন ধরে ব্যবহার প্রচলিত হওয়ায় এর দামও এখন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া শীতল পাটিকে চিত্তাকর্ষণীয় করার জন্য বিভিন্ন ডিজাইন ও মোটিভ ব্যবহার করা হচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ের উপকরণ হিসেবে শীতল পাটি ব্যবহার হয়ে আসছে বহুযুগ ধরে। 

শীতল পাটির প্রধান উপাদান হলো মোরতা। এটি এক প্রকারের নলখাগড়া জাতীয় ঘাস। অঞ্চল ভেদে কোথাও মোরতাকে হারিযাতা গাছ, মোস্তাক আবার কোথাও পাটিগাছ বা পাইত্রা বলা হয়ে থাকে। এ গাছ ঝোঁপ-ঝাঁড়ে, জঙ্গলে, জলাশয়, রাস্তার ধারে, পাহাড়ের পদতলে আপনা আপনি জন্মে।
 
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মধ্যে চট্টগ্রাম, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, খুলনা ও সিলেট অঞ্চলে শীতল পাটি তৈরি হয়। তবে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে উন্নত ও উৎকৃষ্টমানের এবং সবচেয়ে বেশি শীতল পাটি তৈরি হয়। সিলেটের শীতল পাটির চাহিদা দেশে-বিদেশে প্রচুর। এ জেলার বালাগঞ্জ, কমলগঞ্জ, রাজনগর, বড়লেখা, জকিগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে বিশেষত নিম্নাঞ্চলে মোরতা আগাছার মতোই প্রচুর পরিমাণে জন্মে। কোনো কোনো বাড়িতে বেড়ার বদলে পর্দার জন্য চারিদিকে ঘিরে মোরতা লাগানো হয়।
গরমে দেহ মন জুড়ায় যে শীতল পাটি তার পেছনে রয়েছে একদল নারী-পুরুষ-শিশুর দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম। জঙ্গল থেকে এ মোরতা গাছ কেটে প্রথমে ছাঁটা হয়। তারপর প্রতিটি মোরতা বটি বা ছুরি দিয়ে লম্বালম্বি তিন ভাগে কেটে নিপুণ হাতে বেতি তৈরি করে ভাতের মাড়ে ভিজিয়ে রাখা হয়। পরে ভাতের মাড় ও পানির মিশ্রণে সেগুলো সেদ্ধ করা হয়। সেদ্ধ বেত পরিস্কার পানি দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে শুরু হয় পাটি বোনার কাজ। মোরতার উপরিভাগ দিয়ে বানানো হয় মসৃণ এ শীতল পাটি। 

অসম্ভব ধৈর্য আর চমৎকার নৈপুণ্যের সমাহারে সমৃদ্ধ একটি শিল্পকর্ম শীতল পাটি বুনন কাজ। দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে শীতল পাটি শিল্পের সঙ্গে জড়িত থেকে অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেকে এ পেশা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই এ পেশা হারিয়ে যাচ্ছে। 

সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপল্লীতে বসে নিপুণ হাতে নকশি শীতল পাটি তৈরি করছেন শীতল পাটি শিল্পের শিল্পী শ্রীমতি সবিতা মদি ও কৃষ্ণ চন্দ্র মুদি। তারা মা-ছেলে। শ্রীমতি সবিতা মদি বলেন, বংশগত পর্যায়ে আসেন শীতল পাটি তৈরি পেশায়। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের বাপ-দাদা ও তার পূর্বপুরুষরা এ পেশায় জড়িত। আমরা সবাই এ পেশার ওপর নির্ভরশীল। চাচারাও এ পেশায় জড়িত। তারা কেউ কেউ অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সোনারগাঁও লোক কারুশিল্প মেলা, ঢাকার বিসিক মেলা, ব্রাক সেন্টার কারূপণ্য মেলা, শিল্পকলা একাডেমি মেলার কারুশিল্প প্যাভিলিয়নে তারা সবসময় অংশগ্রহণ করেন।

কথা হলো আরো কয়েকজন শীতল পাটি তৈরি শিল্পীর সঙ্গে। আলেয়া বেগম রিনা, চট্টগ্রাম মিরসরাইয়ের পশ্চিম ফুলমোগরা গ্রামে তার বাড়ি। তিনি প্রতিটি পাটি তৈরি করেন দু’তিন দিনে। সংসারে বড় ছেলে খায়রুল ইসলাম সবুজ মায়ের সঙ্গে এ পেশায় হাল ধরেছে। শিল্পী মনোয়ারা বেগম। তিনি সংসারের কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে পাটি বুনন করেন। প্রায় ৪০ বছর যাবত এ পাটি তৈরি করছেন।
 
মীরসরাই, নোয়াখালী ও সিলেটের বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকার প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ এ শিল্পের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। তবে এ শিল্পের কারিগর সবাই মহিলা। সিলেটে এক জনশ্রুতি ছিল উক্ত এলাকায় কনের বাড়ি থেকে প্রদত্ত বিবাহে উপহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে এ শীতল পাটি। 

শীতল পাটি তৈরির শিল্পীরা জানান, শীতল পাটির কারিগর দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগে শীতল পাটির উপকরণ মোরতা কিনতে সাধারণত টাকা লাগত না। তার কারণ এগুলো আগাছার মতো যেখানে সেখানে জন্মাত। কারিগররা সেগুলো সংগ্রহ করে পাটি বুনত। শুধু সময় ও পরিশ্রমের দাম হিসেবে এগুলোর মূল্য নির্ধারিত হতো। কিন্তু আজকের পরিবর্তিত সময়ে সবার মাঝে আর্থিক সচেতনতা এসে গেছে। তাছাড়া বর্তমানে মোরতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
 
অন্যদিকে শীতল পাটি শিল্পীরা বলেন, এই ঐতিহ্যময় ও অতিসমাদৃত শিল্পটি এখন মহাজনের ওপর নির্ভরশীল। মহাজনেরা মোরতার জঙ্গল ইজারা নেয় এবং অতি বেশি মূল্যে কারিগরদের কাছে বিক্রি করে। অনেক সময় দাদনও দিয়ে থাকে। 

শিল্পীরা ক্ষোভের সাথে জানান, বাংলাদেশের অন্যান্য হস্তশিল্পের মতোই এ শিল্পের শিল্পীরা দরিদ্র ও অবহেলিত। সরকারের অন্যান্য শিল্পের মতো এ শিল্পের দিকে একটু নজর দেয়া উচিত। বিশ্বের দরবারে সম্মান সূচক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এ শিল্প। সারাবিশ্বে এ শীতল পাটি শিল্পের শিল্পীদের কাজে পারদর্শিতার নৈপুণ্য ও শিল্পসত্তার ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে। এখন কেন আমরা পিছিয়ে। এখন এ শীতল পাটি শিল্পে সরকারের এগিয়ে আসা একান্ত উচিত বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

টুইটারে আমরা

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২১

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

সৌজন্যে : নোঙর মিডিয়া লিমিটেড