গল্প: সুখীদের দলপতি

267

“পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটা কে জানো?”

-জানি। এবং সুখীদের দলপতি আমি।

• “তুমি ?”

– হাঁ। কারণ আমি বর্তমান থেকে বেরিয়ে ভবিষ্যতে বিচরণ করিনা৷ ভবিষ্যৎ ভেবে ভেবে চোখের নিচে কালি জমায় না। আজকের সিগারেট’টা ভবিষ্যতের কোনো একদিনে মৃত্যু আনবে চিন্তা করে ওটাকে ছুঁড়ে ফেলি না। আমি জানি মানি ও বুঝি বর্তমানই জীবন। জীবনই বর্তমান।

• “অতীত?”

-অতীত মানে অপূর্নতা। এবং জীবনে কিছু কিছু অপূর্নতা থাকা অবশ্য। যা ভেবে কিছুটা সময় যেন বেদনায় বিলাসী হওয়া যায়।

~ শায়েখ কারোর সাথে কথা বলছে না। সে নিজের সাথেই কথা বলছে। বেশির ভাগ সময় সে আত্মকথনে মগ্ন থাকে। নিজের সাথে দার্শনিক কথা বার্তা চালায়। অদ্ভুত না?

হুম অদ্ভুতই তো। শায়েখ নিজেও জানে। রক্তাক্ত চোখ,কেঁদেছে প্রচুর অথচ কাঁদতে কাঁদতেই নিজেকে সুখীদের দলপতি ঘোষনা করেছে! হাসুন।

আমাদের স্রষ্টা কিছু মানুষকে ‘অপ্রাপ্তির’ বেদনা থেকে মুক্ত রাখতে একটা আলাদা ক্ষমতা দিয়েছেন। ওসব মানুষদের চাওয়া পূরণের সক্ষমতা না দিলেও তাদের মস্তিস্কে ও মনে বিজয়ীর অনুভূতি ঢুকিয়ে দিয়েছেন।

শায়েখ তাদেরই একজন। বদ্ধ ঘরে কোনো আলো নেই। বায়ু নেই। ছুপছুপে অন্ধকার। আবদ্ধ বাতাসের পঁচা গন্ধে নিমজ্জিত কক্ষের এক কোণে হেলান দিয়ে সে সকালের শিশু সূর্যের মিষ্টি আলো উপভোগ করতে পারে। পাহাড়ের গায়ে হাঁঁটতে পারে অবিরাম। সমুদ্রে লবণাক্ত জলে পা ভিজিয়ে বালুতে লিখতে পারে ‘পৃথিবী,তুমি আমার,আমার জন্য তুমি’।

• যে মানুষ আবদ্ধ কক্ষে নিজেকে নিমজ্জমান রাখে, বাইরের আলো গায়ে মাখে না সে কেন বলবে পৃথিবী আমার? সে তো পৃথিবীকে দূরে রেখেছে। খুব দূরে।

কী? অবিশ্বাস্য অবিশ্বাস্য লাগে? অবিশ্বাসের কিছু নেই। সবটা স্রষ্টার কারসাজি। তিনি এই ক্ষমতা অকৃপণতার সাথে শায়েখ’কে দিয়েছেন।

শায়েখ একলা। ভাই নেই,বোন নেই। বাবা মায়ের এক সন্তান। আদুরে? নাহ।

তার বাবা মা অতি সজ্জন ব্যক্তি। সমাজে যথেষ্ট সুনাম। প্রতিষ্ঠিত। উচ্চ শিক্ষিত। স্কলার। আছে বিদেশী দিগ্রি।
তাদের ধারণা এবং আশা ও আকাঙখা ছিলো ছেলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে। বর্তমানে রাজ রাজরার শাসন নেই যে বংশানুক্রমিকভাবে শাসন করবে। কিন্তু সমাজে সুশীল তকমা গায়ে মেখে আভিজাত্য জাহিরের সুযোগ তো আছে এখনো। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিতদের দেশে তুলনামুলক কটা কাগজী দামি সার্টিফিকেট থাকলে কত বাহবা পাওয়া যায়। কিছু মানুষের সামনে বুক চেতিয়ে আত্মপ্রচার করা যায়। ওই যে বলেনা? পঁচা গাঁয়ের সেরা মাস্তান।

যেদিন শায়েখ এইচএসসি’তে ফেইল করলো সেদিন তার বাবা টানা ত্রিশ মিনিট গায়ে ঘাম ঝড়িয়ে ত্রিশ মিনিট জুতা পেটা করলো তাকে। আর কটা থাপ্পড় দিয়ে একটা নতুব নাম দিলেন। কোয়ালিটিলেশ গোবেট। পরদিন সন্ধ্যায় সম্ভবত আঁকিখার মাংস খেয়েছিলো তারা।

শায়েখ চেয়েছিলো আত্মহত্যা করবে। ছাদের রেলিঙে দাঁড়িয়ে নিচ দিকে তাকিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলো। গোবেচারা অতো সাহস পাবে কোত্থেকে? ফিরে এসেছিলো রুমে।

মনোবিজ্ঞান বলে,কিছু মানুষ কাম্য বস্তু পেতে ব্যর্থ হলে সে কল্পনার আশ্রয় নেয়। এবং সেটা কল্পনায় পায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পাওয়ার অনুভূতিটা হয় সত্য। সত্য অনুভূতি। এটা দিবাস্বপ্ন।

শায়েখ এখন অর্ধ উলঙ্গ হয়ে সিড়িতে শায়িত। গায়ে কোনো কম্বল কিংবা লেপ নেই। সিড়ি ঠান্ডা। ঠান্ডা খুব। মাঘ মাস কিনা। এই শীতের মধ্যে আবার বৃষ্টি হয়েছে। ঠান্ডা দেহকোষ ফুঁড়ে ফুঁড়ে ঢুকে যাচ্ছে। অথচ খালি গায়ে সিড়িতে শুয়ে শুয়ে সে ঘোষণা দিচ্ছে আমি সুখীদের দলপতি। হার্ভার্ডের ছাত্র।

লেখা:- ফিরোজ আলী