বালিশ-পর্দা দিয়ে শুরু, ক্যাসিনোতে শেষ

355

বিদায়ের পথে ২০১৯। শেষ সময়ে ঘটনাবহুল এই বছরের অঙ্ক কষলে বছরজুড়েই আলোচনায় থাকা বালিশকাণ্ড ও পর্দাকাণ্ডের মতো নতুন নতুন দুর্নীতির দেখা মিলে। এরপর দুদকের অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল বই কেনাসহ অবৈধ সম্পদ অর্জনের ‘শুদ্ধি অভিযানে’ একে একে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল।

এসব দুর্নীতি প্রকাশে আসলে প্রতিরোধে গিয়ে বেশ কয়েকবার আদালতের তোপের মুখে পড়েছে দুর্নীতি প্রতিরোধকারী সংস্থা দুদক। বেসিক ব্যাংক দুর্নীতির তদন্ত আর নির্দোষ জাহালমের কারাভোগের ব্যাপারে সংস্থাটির প্রতি রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করে উচ্চ আদালত। এমনকি আদালতের একটি বেঞ্চে দুদককে নিয়ে এমন মন্তব্যও উঠে আসে- ‘যে বিড়াল ইঁদুর ধরতে পারে না, সেই বিড়াল থাকার দরকার নেই’।

ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা উপস্থিত থাকেন কি না, চিকিৎসকরা নিজেদের কর্মস্থলে রয়েছেন কি না- তা দেখতেও হাঁকডাক দিয়ে মাঠে নেমেছিল দুদক। পরবর্তীকালে আদালত দেশের এই সংস্থাটিকে এসবের চেয়েও বড় বড় দুর্নীতি ঠেকাতে মনোযোগী হতে বলেন।

দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার ও দুদক নিজেদের তৎপরতার নানা খবর দিয়ে এলেও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ধারণা সূচকে ক্রমাগত বেড়েছে দেশের দুর্নীতি।

বিশ্বের ১৮০টি দেশের ওপর টিআই জরিপ চালিয়ে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক সংস্থাটি ২০১৮ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে (ভালো থেকে খারাপ) বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯ নম্বরে। যেখানে গত বছর সংখ্যাটি ছিল ১৪৩। একইভাবে অধঃক্রম অনুসারে (খারাপ থেকে ভালো) প্রতিবেদনটি বিবেচনা করলে আগের ১৭তম অবস্থান থেকে বর্তমানে বাংলাদেশ রয়েছে ১৩ নম্বরে।

পর্দার আড়ালে কে, আর কাদের মাথায় বালিশ?

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর্দা কেনাকাটার ব্যয় আর রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মীদের আবাসন প্রকল্পের খরচ দেখে রীতিমতো অনেকেরই চোখ কপালে উঠেছিল। বছরের মাঝামাঝি সময়ে দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এই দুই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে উঠে আসে দুর্নীতির নতুন এক চিত্র।

এর মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্রিনসিটি আবাসন প্রকল্পের ১৬ ও ২০ তলা ভবনের প্রয়োজনীয় মালামাল কেনা ও ভবনে তোলার কাজে অস্বাভাবিক ব্যয় নজর কাড়ে সবার। প্রায় ৬ হাজার টাকার একটি বালিশ ভবনে ওঠাতে এক হাজার টাকার মতো খরচ দেখানো হয়। পরে গত ১৯ মে বিষয়টি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নজরে আসলে তদন্তের জন্য দুটি কমিটি গঠন করা হয়, উঠে আসে রূপপুরে ৬২ কোটি ২০ লাখ ৮৯ হাজার টাকার অনিয়মের তথ্য। এক পর্যায়ে হাইকোর্টের নির্দেশে গত জুলাইয়ে আদালতে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে চোখ কপালে তোলা এই দুর্নীতির জন্য ৩৪ জন প্রকৌশলীকে দায়ী করা হয়।

পরবর্তীকালে গত ১৭ অক্টোবর ওই অভিযোগসহ আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এরই ধারাবাহিকতায় ১২ ডিসেম্বর পাবনা গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমসহ ১৩ জন প্রকৌশলী এবং ঠিকাদারকে আসামি করে চূড়ান্ত মামলা করা হয়। সবশেষে আদালতের শুনানিতে যাচাই-বাছাই শেষে আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়।

বালিশ নিয়ে তেলেসমাতি কাণ্ডের ঘোর না কাটতেই চোখ ছানাবড়া হয় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি পর্দার দামে। যেখানে হাসপাতালের আইসিইউয়ের রোগীকে আড়াল করে রাখার এক সেট পর্দা কেনা বাবদ খরচ দেখানো হয় ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অস্বাভাবিক ওই ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে উচ্চমূল্যে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটার মাধ্যমে সরকারের ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ চেষ্টার অভিযোগে মামলা করে দুদক।

এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর বই কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগে ৫ হাজার ৫০০ টাকার বই ৮৫ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। পরবর্তীকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর তদন্তে কমিটি গঠন করলেও তার অগ্রগতি আর জানা যায়নি।

অডিও টেপে দুদক কর্মকর্তার ঘুষের গোমর ফাঁস

বছরের মাঝামাঝি সময়ে পুলিশের ডিআইজি (বরখাস্ত) মিজানুর রহমান একটি অডিও টেপ ফাঁস করলে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। বেরিয়ে আসে দুদক কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছিরের থলের বেড়াল।

অভিযোগ উঠে মিজানুর রহমানের সম্পদ অনুসন্ধানে গিয়ে দুদকের তৎকালীন পরিচালক বাছির তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। মিজানের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কথোপকথনের অডিও ক্লিপও গণমাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।

পরবর্তীকালে পরিচালক এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করার পাশাপাশি ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে তাদের উভয়কে আসামি করে মামলা করেন কমিশনের পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা। এরপর উচ্চ আদালতে জামিন চাইতে গেল হাইকোর্ট মামলার আসামি মিজানকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এছাড়া গত ২২ জুলাই এনামুল বাছিরকে রাজধানীর দারুস সালাম এলাকা থেকে গ্রেফতার করে দুদক।

ঘুষ লেনদেনের এই ঘটনা কমিশনকে অনেকাংশেই আস্থার সঙ্কটে ফেলে দেয়। এতে নিজেদের সমালোচনা উঠলে ঘর সামালাতে নড়েচড়ে বসে দুদক। যার ধারাবাহিকতায় ২২ অক্টোবর চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সভাপতিত্বে দুদকের ‘অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন কমিটির’ এক সভায় সংস্থাটির তিনজন উপপরিচালকসহ দুইজন সহকারী পরিচালক এবং তিনজন উপসহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়।

দুদকের ঘাড়ে জাহালমের কারাভোগের দায়

২০১২ সালে আবু সালেক নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের প্রায় ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে ৩৩টি মামলা করে দুদক। এরপর সালেক নামে ওই ব্যক্তিকে তলব করা হয়। দুদকের সেই চিঠি গিয়ে কড়া নাড়ে জাহালমের টাঙ্গাইলের বাড়ির ঠিকানায়।

বাংলাদেশ জুট মিলের নরসিংদীর ঘোড়াশাল শাখার শ্রমিক জাহালম সে সময়ে দুদকের কার্যালয়ে গিয়ে বলেছিলেন, তিনি আবু সালেক নন, সোনালী ব্যাংকে তার কোনো অ্যাকাউন্টও নেই। তাছাড়া ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য আবু সালেকের পরিচয়ে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটাও তার নয়।

কিন্তু দুদকে উপস্থিত বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা জাহালমকেই ‘আবু সালেক’ হিসেবে শনাক্ত করেন। পরবর্তীকালে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোড়াশাল থেকে তাকে গ্রেফতার করে দুদক। এরপর আবারও আদালতে জাহালম দুদকের পরিচয় বিভ্রাটের বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে তার এই দাবি মানতে রাজি ছিল না কেউ।

এক পর্যায়ে নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও জাহালমের তিন বছর ধরে কারাভোগের বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে হাইকোর্ট এ বছরের ২৮ জানুয়ারি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি রুল জারি করে। এরই ধারাবাহিতায় আদালত জানতে চায়- কারাগারে থাকা ‘ভুল’ আসামি জাহালমকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হবে না, তাকে মুক্তি দিতে কেন ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং জাহালমকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না?

সবশেষে উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে গত ৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান জাহালম। এরপর ১১ জুলাই আদালতে দাখিল করা নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে দুদক জানায়, তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুলের কারণে আসামি না হয়েও জাহালমকে কারাভোগ করতে হয়েছে। এ ঘটনায় নিজেদের ১১জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার তথ্য পরবর্তীকালে হাইকোর্টকে জানায় দুদক।

কে খেলেছে ক্যাসিনো, কারা যাচ্ছে ভাসানচরে?

বছরের শেষলগ্নে এসে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মিলাতে গিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সরকার ঘোষিত ‘শুদ্ধি অভিযান’। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর চারটি ক্লাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায় র‌্যাব। বেরিয়ে আসতে থাকে অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করে নিজেদের ঝোলা বোঝাইয়ের নানা চিত্র। এসব কর্মকাণ্ডে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বেশ কয়েকজন নেতার জড়িত থাকার প্রমাণ মিলে।

একে একে অনেক প্রভাবশালী নেতা গ্রেফতারের পর তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে মামলা হয়। পরবর্তীকালে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে এমনভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধানে নামে দুদক। গঠন করা হয় অনুসন্ধান দল, যাতে প্রধান করা হয় দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে।

এভাবে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিত্তবান হওয়া মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে দুদকের জালে ফাঁসেন আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীম, বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনো হোতা সেলিম প্রধান, বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি ও কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ।

এছাড়াও তালিকায় যোগ হয় ঢাকার তিন কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান, তারেকুজ্জামান রাজীব ও এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ, ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, তার সহযোগী এনামুল হক আরমান, যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন, যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী সুমি রহমানের নাম। পরবর্তীকালে তাদের কয়েকজনকে রিমান্ডে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে দুদক।

সবশেষে আওয়ামী লীগের তিন সাংসদ নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন, সামশুল হক চৌধুরী ও মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের প্রায় ২০০ জনের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালায় দুদক।

আলোচনায় থাকা অন্যান্য দুর্নীতি

বছরের শেষ ভাগে এসে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে দুদক। অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, বিচারপতি সিনহা ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ব্যবসায়ী পরিচয়ে দুইজন ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণের ৪ কোটি টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়েছিলেন।

এমন অভিযোগ উঠলে দীর্ঘ তদন্তের পর গত ১০ জুলাই সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন। পরবর্তীকালে ৪ ডিসেম্বর অর্থ আত্মসাতে সিনহার জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে অভিযোগপত্র অনুমোদন করে কমিশন। সবশেষে ১০ ডিসেম্বর অভিযোগপত্রটি আদালতে জমা পড়ে।

এ দিকে, বনানী এলাকার কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ভবনটির নকশা জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ পায়। পরে ভবন মালিক, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও রাজউকের সাবেক দুই চেয়ারম্যানসহ মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক। সবশেষে নকশা জালিয়াতির একটি মামলায় গত নভেম্বরের শুরুতে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

এছাড়া বিদায়ী বছরের বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্য খাতসহ বেশ কয়েকটি খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে দুদক।

সৌজন্যে : দৈনিক অধিকার