বিজয় দিবসে স্বদেশ গড়ার প্রত্যয়

198

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অগণিত মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর এদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বর্তমান অবস্থানে এসেছে দেশ। স্বাধীনতার যে স্বপ্ন ছিল তা কতটুকু অর্জিত হয়েছে সে তুলনা করলে আরো বহুদূর পথ পেরোতে হবে।

স্বাধীনতার পর থেকে সময়ে সময়ে নানা সংকটে পতিত হয়েছিল আমাদের এই মাতৃভূমি। কিন্তু সব সংকট মোকাবেলা করে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে এখনো তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে টিকে আছে। তবে উন্নতি যতটুকু হবার কথা ছিল তা কিন্তু হয়নি। এর জন্য দায়ী আমাদের মাঝে বিদ্যমান পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসা।

পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, ভিয়েতনাম আমাদের চেয়ে তেমন উন্নত ছিল না। ক্ষেত্র বিশেষে আমাদের চেয়েও খারাপ অবস্থানে ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ঐ সব দেশ আজ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পেরেছে। এসব সম্ভব হয়েছে তাদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার কারণে। রাজনৈতিক বিভক্তি থাকলেও এসব দেশ উন্নয়নের প্রশ্নে আপোষ করেনি কখনোই। পায়ে ঠেলেছে বিভক্তি আর মতপার্থক্যকে।

আমরাও আমাদের দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলতে পারি। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক মতপার্থক্য কমিয়ে আনা। সমঝোতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে গুরুত্ব দেওয়া। আর আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এ ব্যপাারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যে যাই বলুক আমাদের একথা স্বীকার করতেই হবে যে, প্রতিহিংসার বৃত্ত থেকে আমরা বের হতে পারিনি। পারিনি দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে। বেড়ে চলেছে সন্ত্রাস, খুন, গুম, ছিনতাই, রাহাজানি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়মসহ নানা কুকীর্তি। প্রভাবশালীদের কাছে জিম্মি সাধারণ ও অসহায় মানুষ।

সম্প্রতি ক্যাসিনো আর দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ। এটা অব্যাহত থাকুক -এমন প্রত্যাশা আমাদের। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়ন যে হচ্ছে না তা নয়। কিন্তু সে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দারিদ্র বিমোচনের জন্য নিতে হবে মহা পরিকল্পনা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে খবর নিলে বহু দরিদ্র মানুষের খোঁজ পাওয়া যাবে। হয়তো যাদের পাশে কেউ নেই। দুঃখ, কষ্টে জীবন চলছে। মানুষের দরিদ্রাবস্থা দূর করতে না পারলে উন্নয়ন স্বপ্নই থেকে যাবে। আগে দরিদ্র মানুষের জীবন মানের উন্নতি ঘটাতে হবে। বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সব স্তরে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দূর করতে হবে। সব ধরনের নিয়োগ, ভর্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। নৈতিক চরিত্র গঠন উপযোগী ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে। সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন ফাঁস রোধ করতে হবে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে। সব ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যেন দুর্নীতি জেঁকে বসে থাকতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। আর্থিক অস্বচ্ছতা ও অপচয় দেশের সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সড়ক–মহাসড়কের উন্নয়ন হচ্ছে। সেতু, কালভার্ট, ফ্লাইওভার তৈরী হচ্ছে। গড়ে উঠছে বড় ও সুন্দর সুন্দর দালান কৌঠা। দৃশ্যমান হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মাসেতু। ক্রিকেটে উন্নতি করছে দেশ। পোষাক শিল্প ও আইসিটি খাতের অগ্রগতি হচ্ছে। এরপরও আমরা উন্নতি করতে পারছি না। সেটা আমাদের নিজেদের কারণে। উন্নয়নের জন্য আমরা এক হতে পারি না। একে অন্যেরটা সহ্য করতে পারি না। দলাদলি আর রাজনৈতিক সংকট আমাদের দেশটাকে কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে। এভাবে হলে সমৃদ্ধির পথে এগোবে না দেশ।

দেশটা সুন্দর হোক, সমৃদ্ধশালী হোক এটাই আমাদের চাওয়া। সব ভেদাভেদ ভুলে গড়তে হবে সমৃদ্ধ একটি দেশ বাংলাদেশ। এবারের বিজয় দিবসে এমন প্রত্যয় হোক সকলের।