ঐতিহ্যে ভরপূর নবাবদের শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জ

237

‘আমের দেশ’ নামে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত এই জেলাটিকে কখনও নবাবগঞ্জ এবং কখনও চাঁপাই নামেও ডাকা হয়।

ভারত উপমহাদেশ বিভাগের আগে এটি মালদহ জেলার একটি অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে এটি মালদহ থেকে আলাদা হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং রাজশাহী জেলার একটি মহাকুমা হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৮৪ সালে একটি একক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

১,৭৪৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ জেলাটির অবস্থান বাংলাদেশের মানচিত্রে সর্ব পশ্চিমে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পূর্বে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলা, উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ জেলা, পশ্চিমে পদ্মা নদী ও মালদহ জেলা, দক্ষিণে পদ্মা নদী ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলা।

৩টি পৌরসভা, ৪৫টি ইউনিয়ন, ১১২০টি গ্রাম নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাটি ৫টি উপজেলায় বিভক্ত। উপজেলা গুলো হলো, নবাবগঞ্জ সদর, নাচোল, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, ভোলাহাট।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাটি ‘নবাবগঞ্জ’ নামে পরিচিত ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামকরণ সম্পর্কে জানা যায়, প্রাক ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চল ছিল মুর্শিদাবাদের নবাবদের বিহারভূমি এবং এর অবস্থান ছিল বর্তমান সদর উপজেলার দাউদপুর মৌজায়।

নবাবরা তাঁদের পাত্র-মিত্র ও পরিষদ নিয়ে এখানে শিকার করতে আসতেন বলে এ স্থানের নাম হয় নবাবগঞ্জ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামের ইতিবৃত্ত নবাব আমলে মহেশপুর গ্রামে চম্পাবতী মতান্তরে ‘চম্পারানী বা চম্পাবাঈ’ নামে এক সুন্দরী বাঈজী বাস করতেন। তাঁর নৃত্যের খ্যাতি আশেপাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি নবাবের প্রিয়পাত্রী হয়ে ওঠেন। তাঁর নামানুসারে এই জায়গার নাম ‘চাঁপাই’। এছাড়া এ অঞ্চলে রাজা লখিন্দরের বাসভূমি ছিল। লখিন্দরের রাজধানীর নাম ছিল চম্পক। চম্পক নাম থেকেই আসে চাঁপাই।

২০০১ সালের ১লা আগস্ট জেলাবাসীর দাবীর তোপে সরকারিভাবে নবাবগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাখা হয়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ জেলার জনসংখ্যা চৌদ্দ লাখ পঁচিশ হাজার তিনশত বাইশ জন (জেলা পরিষদ হিসাব অনুযায়ী)।

শিক্ষার মানের দিক থেকে বেশ উন্নত চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলায় শিক্ষিত নাগরিক প্রায় ৬৯ শতাংশ। এ জেলাতে ৩৭০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৮২টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ২০৪টি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ৪টি সরকারি কলেজ, ৪৮টি বেসরকারি কলেজ, ১২৮টি মাদ্রাসা, ৩টি সরকারী কারিগরি প্রতিষ্ঠান, ১০টি বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠান, ১টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১টি যুব উন্নয়ন কেন্দ্র। তাছাড়া রয়েছে বেশ কিছু কিন্ডারগার্টেন।

সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এ জেলার বহু মানুষ আমদানি ও রপ্তানি ব্যবসা করে। উত্তরবঙ্গে পাথর আমদানির সবচেয়ে বড় মাধ্যম চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ (জিরো পয়েন্ট) বর্ডার। স্থলবন্দরটি দিয়ে প্রতিদিন অগণ্য ট্রাক পাথর আসে। এছাড়াও আসে ফল ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস।

তাছাড়া জেলার প্রায় প্রতিটি মানুষ আম ব্যবসার সাথে জড়িত। আম ব্যবসার জন্য উপযুক্ত স্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। আমের মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা হয়ে উঠে লোকে লোকারণ্য। চাঁপাইনবাবগঞ্জের থেকে বড় আমের বাজার বাংলাদেশের আর কোথাও দেখা যায় না।

এছাড়াও এখানে অন্যান্য সকল কৃষিজনিত ফসল হয়ে থাকে। জেলার অসংখ্য মানুষ কৃষিকাজের সাথে জড়িত রয়েছেন।

বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের অন্যতম ধারা গম্ভীরা তুলে ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় শিল্পিরা। গম্ভীরা দলবদ্ধভাবে গাওয়া বর্ণনামূলক গান। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা অঞ্চলের গম্ভীরার মুখ্য চরিত্রে নানা-নাতি খুব জনপ্রিয়। ধারণা করা হয় যে, গম্ভীরা উৎসবের প্রচলন হয়েছে শিবপূজাকে কেন্দ্র করে। শিবের এক নাম ‘গম্ভীর’, তাই শিবের উৎসব গম্ভীরা উৎসব এবং শিবের বন্দনাগীতিই হলো গম্ভীরা গান। গম্ভীরা উৎসবের সঙ্গে এ সঙ্গীতের ব্যবহারের পেছনে জাতিগত ও পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষদের উচ্চারণ শৈলী প্রমিত বাংলা থেকে একটু আলাদা। এদের উচ্চারণ ভারতের মালদাবাসীদের সাথে কিছুটা মিল রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে হওয়া প্রতিটি আন্দোলনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালীন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বহু মানুষ যুদ্ধে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ৬ অক্টোবর শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নের শিকারপুরে পাকবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের এক লড়াইয়ে প্রায় ২০০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১০ অক্টোবর পাকবাহিনী শিবগঞ্জ উপজেলার দোরাশিয়া, মোল্লাটোলা, লম্পট ও রাধাকান্তপুর গ্রামের ৪৭ জন লোককে নির্মমভাবে হত্যা করে।

১৬ অক্টোবর ভোলাহাট উপজেলার কাশিয়াবাড়িতে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৪ ডিসেম্বর নবাবগঞ্জে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সদরের রেহাইচর নামক স্থানে শহীদ হন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় এ জেলাতে রয়েছে বেশ কিছু ভ্রমণের স্থান, যেখানে প্রতিদিনই প্রায় দেশের সর্বত্র থেকে ছুঁটে আসে বহু পর্যটক।

নবাবদের ভূমি চাঁপাইনবাবগঞ্জে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন ভবন ও মসজিদ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, ছোট সোনা মসজিদ, তোহাখানা, শাহ নেয়ামতুল্লাহ এর মাজার, চামচিকা মসজিদ, দারাসবাড়ি মসজিদ, ধানিয়াচক মসজিদ, নাচোল রাজবাড়ী, কানসাটের জমিদার বাড়ি ও নীলকুঠি।

এছাড়াও এ জেলায় রয়েছে বেশ কিছু পার্ক। এর মধ্যে রয়েছে, স্বপ্নপল্লী, বাবুডাইং, গোয়াইন বাধ, টাংঘন পিকনিক পার্ক, ছোট সোনা মসজিদ পার্ক, কাজী জালালের আম বাগান। এছাড়াও রয়েছে বর্তমানে সর্ব প্রাচীন প্রত্নসম্পদ ও লুকায়িত ইতিহাস সমৃদ্ধ স্থান নওদা বুরুজ।

বাংলাদেশের সকল স্থান থেকেই রেল ও সড়কযোগে যাওয়া যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। জেলায় রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের তিন তারকা হোটেল। এছাড়াও স্থলবন্দর দিয়ে বৈধভাবে খুব সহজেই ভারত যাওয়া যায়। তাই নবাবদের ভূমি উপভোগের জন্য যে কেউ চলে আসতে পারে চাঁপাইনবাবগঞ্জে।