"পুতুল নাচের ইতিকথা"য় আমাদের কথা
  1. [email protected] : জাহিদ হাসান দিপু : জাহিদ হাসান দিপু
  2. [email protected] : মোঃ জিলহজ্জ হাওলাদার, খুলনা : মোঃ জিলহজ্জ হাওলাদার, খুলনা
  3. [email protected] : বার্তা ডেস্ক : বার্তা ডেস্ক
  4. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  5. [email protected] : দৈনিক নোঙর ডেস্ক : দৈনিক নোঙর ডেস্ক
  6. [email protected] : দৈনিক নোঙর ডেস্ক : দৈনিক নোঙর ডেস্ক
  7. [email protected] : আল-আসিফ ইলাহী রিফাত : আল-আসিফ ইলাহী রিফাত
  8. [email protected] : Shaila Sultana : Shaila Sultana
  9. [email protected] : দৈনিক নোঙর ডেস্ক : দৈনিক নোঙর ডেস্ক
  10. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  11. [email protected] : অনলাইন ডেস্ক : অনলাইন ডেস্ক
  12. [email protected] : Sobuj Ali : Sobuj Ali
"পুতুল নাচের ইতিকথা"য় আমাদের কথা
বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৩১ অপরাহ্ন

“পুতুল নাচের ইতিকথা”য় আমাদের কথা

প্রতিবেদকের নাম
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
  • ৫৪৯ জন পড়েছেন

মানিক বন্দোপাধ্যায়ের “পুতুল নাচের ইতিকথা” উপন্যাসে প্রধান চরিত্র ডাক্তার শশী কলিকাতা কলেজে পড়িয়া ডাক্তার হয়েছে এবং ডাক্তার হয়ে গ্রামে ফিরে এসে গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের সান্নিধ্যে থেকে মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে সময় অসময় যেসব উপলব্ধি গড়ে উঠেছে সেইসব বিষয় গুলো এক দুই তিন করে নিচে পয়েন্ট আকারে সাহিত্যি ভাষায়ই প্রকাশ করছিঃ-

১.
যেদিন শশী ডাক্তার হয়ে শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসেছে ঠিক সেইদিনই বজ্রাঘাতে হারুর মৃতদেহ শশীর চোখে পড়ে এবং গোবর্ধনের নৌকায় তুলে গ্রামের বাড়ি ফিরে।
শশী তখন বিরক্ত হয় নাই,অন্যমনষ্ক হইয়া গিয়াছিল।হারুর মরনে সংস্রবে অকস্মাৎ আসিয়া পড়িয়া শশীর কম দুঃখ হয় নাই। কিন্তু তার চেয়েও গভীর ভাবে নাড়া খাইয়াছিল জীবনের প্রতি তাহার মমতা। মৃত্যু এক একজনকে এক-একভাবে বিচলিত করে। আত্মীয় পরের মৃত্যুতে যাহারা মর-মানবের জন্য শোক করে শশী তাহাদের মত নয়।একজনকে মরিতে দেখিলে তাহার মনে পড়িয়া যায় না সকলেই একদিন মরিবে,–চেনা -অচেনা আপন পর যে যেখানে আছে প্রত্যেকে এবং সে নিজেও। শ্মশানে শশীর শ্মশান-বৈরাগ্য আসে না।জীবনটা সহসা তাহার কাছে অতি কাম্য, অতি উপভোগ্য বলিয়া মনে হয়,মনে হয়, এমন একটা জীবনকে সে যেন এতকাল ঠিকভাবে ব্যবহার করে নাই।মৃত্যু পর্যন্ত অন্যমনষ্ক হইয়া বাঁচিয়া থাকার মধ্যে জীবনের অনেক কিছুই যেন তাহার অপচয়িতা হইয়া যাইবে। শুধু তাহার নয়, সকলের। জীবনে আর এই ক্ষতি প্রতিকারহীন।মৃত্যুর সান্নিধ্য এইভাবে এইদিক দিয়া শশীকে ব্যথিত করে।

২.
কুসংস্কারাচ্ছন্ন যাদব এক রহস্যময় চরিত্র পুতুল নাচের ইতিকথায়।

“মিনিট দশেক পরে যাদব উঠিয়া বলিলেন, যাবে নাকি শশি বাড়ির দিকে..?
শশী বলিল চলুন। লাঠি ঠুকিয়া যাদব পথ চলেন। শশী জানে এতো জোরে লাঠির শব্দ করা সাপের জন্য। মরিতে যাদব ভয় পান,-জীবনমৃত্যু যার কাছে সমান হইয়া গিয়াছে? অথবা শুধু সাপের কামড়ে মরিতে তাহার ভয়?

চলিতে চলিতে যাদব বলিলেন, তুমি তো ডাক্তার মানুষ শশী,চরক সশ্রুত ছেড়ে বিলাতে বিদ্যে ধরেছো, কেটে ছিড়ে গা ফুড়ে মরা মানুষ বাঁচাও, —ব্যাপার টা কি বলো দেখি তোমাদের? সত্যি সত্যি কিছু আাছে নাকি তোমাদের চিকিৎসা শাস্ত্রে..?”

শশী বলিল, আজ্ঞে আছে বইকি পন্ডিত মশায়,-
কারও একার খেয়ালে তো ডাক্তারি শাস্ত্র হয়নি।হাজার হাজার বৈজ্ঞানিক সারাজীবন পরীক্ষা করে করে সব আবিষ্কার করেছেন, নাহলে জগৎসুদ্ধ লোক—

যাদব বলিলেন, সূর্য বিজ্ঞান না জানা সব বৈজ্ঞানিক তো..?আদি জ্ঞান যার নেই পরবর্তী জ্ঞান সে পাবে কোথায় শশী.?যেমন তোমরা সব একালের ডাক্তার, তেমনি সব কবিরাজ দৃষ্টিহীন অন্ধ সব।গাছের পাতার রস নিংড়ে ঔষধ করলে, গাছের পাতার ঔষধের গুণ এলো কোথা থেকে.? সূর্যরশ্মিকে তেজস্বর ওষুধে পরিণত করে রোগীর দেহে নিক্ষেপ করে,মুহূর্তে নিরাময়।মোটা মোটা বই পরে ছুরি কাচি চালাতে শিখে কি হয়.?
মনে মনে শশী রাগে। গ্রাম্য মনের অপরিত্যাজ্য সংস্কারে সেও যাদবকে ভক্তি কম করে না,তাই সায় না দিলেও তর্ক করা সে করিতে পারে না।

বাড়ি র সামনে এসে যাদব বলেন,কলকাতা থেকে আঙ্গুর এনেছি দুটি খেয়ে যাও শশী-মুখে বিরুদ্ধ সমালোচনা করিলেও শশীকে যাদব স্নেহ করেন,স্নেহ ও বিদ্বেষ যার কাছে সমান..? শশী বলিতে পারে না আঙ্গুর খাওয়ার শখ তাহার নাই।

৩.
পুতুল নাচের ইতিকথায় ডাক্তার শশী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কুসংস্কার মুক্ত মানুষ হয়েও কিভাবে গ্রামের ঝঞ্ঝাটময় মূহুর্তগুলোকে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষের অপমান অপদস্থ শ্রদ্ধা সম্মান ভক্তি সমস্ত কিছু ছাপিয়ে নিজেকে শান্ত স্থির গতিশীল দরদী মন নিয়ে মানুষের জীবনচক্রের জীবনক্ষত গুলো দূর করার জন্য কিভাবে নিজেকে আপ্রাণ নিয়োজিত মগ্ন রাখতে পারলেন তার একটা দৃষ্টান্তময় উপলব্ধি আমরা দেখতে পাই ——–

মাঝে মাঝে শশীকেও সে অপমান করে, শশী গায়ে মাখে না। আগে শশী কারও অপমান সহ্য করিত না, আজকাল তাহার এক প্রকার অদ্ভুত ধৈর্য্য আসিয়াছে, যামিনি কথায় কথায় তাহার একেবারেই রাগ হয় না।সেনদিদির অসুখ উপলক্ষে ওর যে পরিচয় সে পাইয়াছে তাহাতে বুঝিতে তাহার বাকি থাকে নাই যে, সংসারে বদ্ধ পাগল ছাড়াও কম বেশী অনেক পাগল আছেঃ

এক – এক বিষয়ে মাথায় যাহাদের অত্যাশ্চর্য বিকার থাকে।যামিনিও তাদেরই একজন।ওর অর্থহীন অপমান রাগ করিলে নিজেও সে এমনি পাগলের দলে গিয়া পড়িবে।
তাছাড়া আর একদিক দিয়া শশীর মন শান্ত হইয়া স্থিতিলাভ করিয়াছিল।

তাহার ইনটেলেকচুয়াল রোমান্সের পিপাসা।যাহা চায়ের ধোঁয়ার মতো,জলীয় বাষ্প ছাড়া আর কিছু নয়! জীবনকে দেখিতে শিখিয়া, অত্যন্ত অসম্পূর্ণ ভাসা ভাসা ভাবে জীবনকে দেখিতে শিখিয়া, সে অবাক হইয়া দেখিয়াছে যে এই খানে, এই ডোবা আর জঙ্গল আর মশাভরা গ্রামে জীবন কম গভীর নয়,কম জটিল নয়,।

একান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে গ্রামে ডাক্তারি শুরু করিয়া ক্রমে ক্রমে এ জীবন শশীর যে ভালো লাগিতেছে, ইহাই তাহার প্রথম ও প্রধান কারণ।তারপর যাত্রাদলের অভিনেতা সাজিয়া কুমুদের আবির্ভাব। মোনালিসার কুমুদ,ভেনাস ও কিউপিডের কুমুদ, শেলি বায়রন হুটম্যানের কুমুদ, পেগ খাওয়া waltz fox -trot নাচা কুমুদ, নীলাক্ষীর প্রেমিক কুমুদ, তাহার চেয়ে বয়সে জ্ঞানে বিদ্যায় বুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠ কুমুদঃ যাত্রাদলের অভিনেতা সমাজ যা তাহার আবির্ভাব এ কি ব্যর্থ যায়.?শশীর মন শান্ত হইয়াছে, স্থিতি লাভ করিয়াছে।

কেমন করিয়া হঠাৎ সে বুঝিতে পারিয়াছে কিডস্কিনের জুতাটা, আশ্চর্য শাড়িটা, বিস্ময়কর ব্লাউজটাই আসল। আর আসল তখনকার কুমুদের টাকাটা। তারপর চেহারাটা তো আছেই। সেটাও একটু দরকার, আর দরকার বিশ্বজগতকে একটু ডোন্ট কেয়ার করার ভাব। জমিলো রোমান্স।

শশী এটা বুঝিয়াছে। কিন্তু হিসাব তো কম নয়.? অতগুলি সমন্বয় তো তুচ্ছ নয়?
এটাও শশী স্বীকার করে। স্বীকার করে যে ব্যাপারটা মন্দ নয়।মানুষের সভ্যতা খুবই অগ্রগতির পরিচয়, চমৎকার উপভোগ লোভ করিবার মতো। পাইলে সে লাভবান হইতো। কিন্তু বঞ্চিত হইয়াছে বলিয়া মনের মধ্যে অসন্তোষ পুরিয়া রাখিবার মতোও কিছু নয়।শশী ইহাও বুঝিয়াছে যে, জীবনকে শ্রদ্ধা না করিলে জীবন আনন্দ দেয় না। শ্রদ্ধার সঙ্গে আনন্দের বিনিময়, জীবনদেবতার এই রীতি।
শশী তাই প্রাণপনে জীবনকে শ্রদ্ধা করে। সংকীর্ণ জীবন, মলিন জীবন,দুর্বল পঙ্গু জীবন সমস্ত জীবনকে। নিজের জীবনকে সে শ্রদ্ধা করে সকলের চেয়ে বেশী।

৪.
দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট গ্রামের কুন্দ।কুন্দ বলে, “খেমির মা আমাদেরও নিউমোনিয়া করিয়ে মারবেন নাকি শশীদাদা.? কচি ছেলে নিয়ে কাচা ঘরে আছি, কত সাবধানে থাকতে হয় আপনি তার কি বুঝবেন.? এ তো দলান নয়, পাকা ঘর তে আর আমাদের ভাগ্যে নেই যে —”

প্রত্যেক কথায় কুন্দ এমনি নালিশ টানিয়া আনে।এই তাহার স্বভাব। বাড়ির লোকের স্বাস্থ্য ভালো করার চেষ্টা শশী ত্যাগ করিয়াছে। প্রথমটা ভয়ানক রাগ হইয়াছিল, ক্রমে ক্রমে সে করিয়াছে জ্ঞান লাভ।

সে বুঝিয়াছে, তার স্বাস্থ্যনীতি পালন করিতে গেলে জীবনের সংগতি ওদের একেবারে নষ্ট হইয়া যাইবে, অসুখী হইবে ওরা। রোগে ভুগিয়া অকারণে মরিয়া ওরা বড় আনন্দে থাকে।স্ফুর্তি নয়,আনন্দ –শান্ত স্তিমিত একটা সুখ।

স্বাস্থ্যের সঙ্গে, প্রচুর জীবনীশক্তির সঙ্গে ওদের জীবনের একান্ত অসামঞ্জস্য। ওরা প্রত্যেকে রুগ্ন অনুভূতির আড়ত,সংকীর্ণ সীমার মধ্যে ওদের মনের বিস্ময়কর ভাঙ্গাগড়া চলে, পৃথিবীতে ওরা অস্বাস্থ্যকর জলাভূমির কবিতাঃ ভ্যাবসা গন্ধ, আবছা কুয়ূছা, শ্যামল, শৈবাল, বিষাক্ত ব্যাঙ্গের ছাতা, কলমি ফুল।সতেজ উত্তপ্ত জীবন ওদের সহিবে না।শশী ভাবে। ভাবিয়া অবাক হয় শশী।

কুমুদ একদিন এই ধরনের একটা লেকচার ঝাড়িয়াছিল, পৃথিবীসুদ্ধ লোক যে কত বোকা এই কথাটা প্রমাণ করিবার জন্য। কাপড়-মাপা গজ দিয়া আমরা নাকি রং মাপি,জীবনের অবস্থার হিসবে স্থির করি মনের সুখ দুঃখ বলি মানুষ দুঃখী, আর রাগে গরগর করি।মিথ্যা তো বলে নাই কুমুদ, শশী ভাবে।

চিন্তার জগতে সত্যসত্যই আমাদের স্তর বিভাগ নাই। বস্তু আর বস্তুর অস্তিত্ব এক হইয়া আছে আমাদের মনে। কখনো কি ভাবিয়া দেখি মানুষের সঙ্গে মানুষের বাচিয়া থাকার কোন সম্পর্ক নাই.?মানুষটা যখন হাসে অথবা কাঁদে তখন হাসিকান্নার সঙ্গে জড়াইয়া ফেলি মানুষটাকে, মনে মনে মানুষের গায়ে একটা লেবেল আটিয়া দিই —সুখী অথবা দুখী। লেবেল আটা দোষের নয়। সব জিনিসেরই একটা সংজ্ঞা থাকা দরকার। কে হাসে আর কে কাঁদে এটা বোঝানোর জন্য দু দশটা শব্দ ব্যবহার করা সুবিধা জনক বটে। তার বেশী আগাই কেন..? কেন পরিবর্তন চাই.? নিঃশব্দে অশ্রু মুছিয়া আনিতে চাই কেন সশব্দে উল্লাসে?

রোগ শোক দুঃখ বেদনা বিষাদের বদলে শুধু স্বাস্থ্য বিস্মিত সুখ আনন্দ উৎসব থাকিলে লাভ কিসের.?
আরও মজা আছে। লাভ না থাক, ক্ষতিই বা কি?
ভাবিতে ভাবিতে রীতিমতো বিহ্বল হইয়া যায় বইকি শশী! সে রোগ সারায়, অসুস্থকে সুস্থ করে। অথচ একেবারে চরম হিসাব ধরিলে এই সত্যটা পাওয়া যায়ঃ
রোগে ভোগা, সুস্থ হওয়া, রোগ সারানো, রোগ না সরানো সমান—রোগীর পক্ষেও,শশীর পক্ষেও। এসব ভাবিতে ভাবিতে কত অতীন্দ্রিয় অনুভূতি যে শশীর জাগে!
রহস্যানুভূতির এ প্রক্রিয়া শশীর মৌলিক নয়,সব মানুষের মধ্যে একটা খোকা থাকে যে মনের কবিত্ব, মনের কল্পনা, মনের সৃষ্টিছাড়া অবাস্তবতা, মনের পাগলামিকে লইয়া সময়ে অসময়ে এমনি ভাবে খেলা করিতে ভালোবাসে।

আরো অসংখ্য অনুভূতি, ঘটনা রয়েছে উপন্যাসটির পরতে পরতে,অন্য একদিন লিখবো।

লেখক ঃ অনন্ত হিমাদ্রি

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২১

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

সৌজন্যে : নোঙর মিডিয়া লিমিটেড