অবসরে চলে যান গৌড় নগরী চাঁপাইনবাবগঞ্জ

কাজের চাপে নাকাল হয়ে অনেকেই ছুটে যেতে চান শহর থেকে দূরে কোথাও। কোলাহলমুক্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যরূপে ভরপুর এলাকায় যেতে চান? ছুটিতে চলে যেতে পারেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানের সমাহারী চাঁপাইনবাবগঞ্জ আপনার পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রথমেই ঘুরবেন কোথায়, এ ভাবনা মাথায় আসতেই সর্বপ্রথমেই হয়তো আপনার মনে হবে ছোট সোনামসজিদ, তোহাখানা, দারসবাড়ি মসজিদ ও মাদ্রাসা, ষাঁড় বুরুজ, মহানন্দা নদীর ওপর অবস্থিত ‘শেখ হাসিনা সেতু’ দেখতে গেলে মন্দ হয় না।

নয়নাভিরাম প্রকৃতির সঙ্গে ইতিহাসের অনন্য কীর্তি যাঁদের আকর্ষণ করে, তাঁদের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ঘুরে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। নিরিবিলি প্রকৃতির সান্নিধ্যে সীমান্তবর্তী এই জেলা বাংলার প্রাচীন জনপদ গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেন বংশের রাজাদের খনন করা দীঘি আর সুলতানি আমলের মুসলিম শাসকদের স্থাপিত মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা এই জেলাকে দিয়েছে ঐতিহাসিক সমৃদ্ধি।

সে সঙ্গে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত বেশ কয়েকটি স্থাপনা ইতিহাসের পুনর্পাঠ হিসেবে দেখা যাবে। দূর অতীতের পুণ্ড্রবর্ধন, গৌড় ও জান্নাতাবাদের মতো আলোকিত স্থান ও ঐতিহ্যে লালিত ধনজনে পূর্ণ এক সমৃদ্ধশালী অঞ্চল এ চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ঢাকা থেকে ৩১৭ কিলোমিটার আর বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে দূরত্ব মাত্র ৮২ কিলোমিটার।

এ ছাড়া আম, রেশম, কাঁসা, পিতল, লাক্ষা, নকশিকাঁথা ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গান, আলকাপ, টপ্পা গান ও লোককাহিনীর এ জেলার স্বকীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়।

ঐতিহাসিক ছোট সোনামসজিদ

জেলাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় নানা পুরাকীর্তির নিদর্শনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি গৌড়ের ঐতিহাসিক ছোট সোনামসজিদ। মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন। মসজিদের চারকোণে চারটি অষ্টকোনাকৃতির মিনার বা টারেট। ওপরে ১২টি অর্ধগোলাকৃতির ও তিনটি চৌচালা আকৃতির মোট ১৫টি গম্বুজ আছে। গম্বুজগুলোতে একসময় সোনার পিণ্ড ছিল বলে মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে সোনামসজিদ, এমন একটি জনশ্রুতি রয়েছে। স্থাপত্যকলা ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের বিচারে এ মসজিদ গৌড়ের রত্ন বলে উল্লেখ করেন ঐতিহাসিকরা। মসজিদটি সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে ওয়ালী মুহাম্মাদ কর্তৃক ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত হয়। মসজিদের পাশেই শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি।

তোহাখানা

ঐতিহাসিক ছোট সোনামসজিদের অদূরেই অবস্থিত তোহাখানা। ১৬৫৫ সালে শাহ সুজা এটি নির্মাণ করেন। কথিত আছে, তাপনিয়ন্ত্রিত ইমারত হিসেবে এটি নির্মাণ করা হয়। আর এর পাশেই রয়েছে মোগল আমলের একটি মসজিদ ও হজরত শাহনেয়ামতুল্লাহর মাজার।

দারসবাড়ি মসজিদ ও মাদ্রাসা

স্থলবন্দর ও ছোট সোনামসজিদের মধ্যবর্তী শিবগঞ্জ উপজেলার ওমরপুর নামক জায়গার পাশে দারসবাড়ি মসজিদ ও মাদ্রাসা। একটি আরবি শিলালিপি অনুসারে ৮৮৪ হিজরি অনুযায়ী ১৪৭৯ সালে সুলতান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে তারই নির্দেশে মসজিদটি নির্মিত হয়।

যদিও পরিত্যক্ত অবস্থায় অযত্ন-অবহেলায় রয়েছে স্থাপনাটি, তবু বিশাল মসজিদ, তার ভেতর আর বাইরের অনন্য নকশা কারুকার্য মোহিত করবে নিঃসন্দেহে।

মসজিদের পূর্বে ছোট দীঘির পাশেই বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে দারসবাড়ি মাদ্রাসা। আরবি ‘দারস’ শব্দের অর্থ পাঠ বা অধ্যয়ন। জেনারেল কানিংহাম এটিকে শিক্ষাকেন্দ্র (কলেজ) বলে উল্লেখ করেছেন। ধারণা করা হয়, ১৫ শতকে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর আমলে নির্মিত এই মাদ্রাসা বাংলাদেশের মুসলমানদের শিক্ষাকেন্দ্রের নিদর্শন। একসময় মাদ্রাসাটিতে বর্তমানের বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষা দেওয়া হতো। এখানে নদিয়া, পশ্চিম দিনাজপুর, মালদহ, দেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের লোকজন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করত। ৩০০ শিক্ষক পাঠদান করতেন বলে জানা যায়।

ষাঁড় বুরুজ/নওদা বুরুজ

জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে অবস্থিত ইতিহাসসমৃদ্ধ জায়গার নাম নওদা বুরুজ। রহনপুর খোয়াড়ের মোড় থেকে সোজা প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে এটি অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে এটি ষাঁড় বুরুজ হিসেবে পরিচিত। দেখতে অনেকটা বড়সড় এক ঢিবির মতো।

এ ছাড়া জেলার ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে আরো রয়েছে দাদনচক মসজিদ, খঞ্জন দীঘি বা রাজাবিবির মসজিদ, ধনিয়াচক মসজিদ, বালিয়াদীঘি, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মাঝপাড়া বালিগ্রাম ৬ গম্বুজ মসজিদ, নবাবি আমলে নির্মিত মহারাজপুর জামে মসজিদ, ঐতিহাসিক নীলকুঠি, ভোলাহাটের চামচিকা মন্দির, গিলাবাড়ী প্রাচীন শিবমন্দির, কাজী সাহেবের মসজিদ, রহনপুরের গম্বুজ ও অতি প্রাচীন ঠাকুরবাড়ি, যা মাহান্ত বাড়ি নামে সমধিক পরিচিত। রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনামসজিদ স্থলবন্দর।

সন্ধ্যায় আড্ডা দিতে পারেন মহানন্দা নদীর ওপর অবস্থিত ‘শেখ হাসিনা সেতু’তে। কিছু সুন্দর সময় কাটবে। আর জেলা শহর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত, প্রকৃতির নৈসর্গিক লীলাভূমি ‘বাবুডাইং’-এ ঢু মারতে ভুলবেন না। বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ লালমাটি, উঁচু-নিচু ২৬ টিলা ও সারি সারি সবুজ অরণ্যের সমন্বয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ‘বাবু ডাইং’-এর সৌন্দর্য আপনার ভ্রমণকে করবে আরো চিত্তাকর্ষক। আর বাবুডাইং-এর পাশেই রয়েছে আদিবাসী পল্লী। পরিচিত হওয়া যাবে তাঁদের কৃষ্টি-কালচার ও সংস্কৃতির সঙ্গেও।

আমের রাজধানী হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ। তাই আমের মৌসুমে জেলা বিস্তৃত আমের বাগানগুলো দর্শনার্থীদের আকর্ষণে বাড়তি মাত্রা যুক্ত করে। ছায়া-সুনিবিড় আমের বাগানে ঘোরাঘুরির পাশাপাশি নির্ভেজাল পুষ্টিসমৃদ্ধ এই আমের স্বাদ নিতে কে না চায়। ঘুরে দেখার তালিকায় অবশ্যই কানসাটের আমের হাট রাখা দরকার।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরাসরি আসতে পারেন বনলতা এক্সপ্রেসে। অথবা ঢাকা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম সড়কপথে। সময় লাগে সাত থেকে আট ঘণ্টা। জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটারের মধ্যেই অধিকাংশ ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রতিটি স্থাপনার দূরত্ব খুব সামান্যই। হানিফ, শ্যামলী, ন্যাশনাল ট্রাভেলস, দেশ পরিবহনসহ প্রায় সকল উন্নতমানের বাস চলে। ভাড়া পড়বে ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা।

থাকার ব্যবস্থা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর ও শিবগঞ্জ উপজেলা শহরে থাকার জন্য রয়েছে স্বল্প খরচে বেশকিছু হোটেলের ব্যবস্থা। এসি, ননএসি দুটোই মিলবে।

লেখাটি পড়তে পড়তে হয়তো অনেকে এই ছুটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। ঘুরে আসুন বাংলাদেশের উত্তরের জেলা শহরটি। নিশ্চিত থাকুন এ শহর আপনাকে মুগ্ধ করবেই।