ক্ষ্যাপাটে দার্শনিক ডায়োজিনিস

বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিস দ্য সিনিকের নাম শুনলেই আমাদের মাথায় আসে ক্ষ্যাপাটে এক দার্শনিকের কথা। তিনি ছিলেন একজন উদ্ভট জ্ঞানের সাধক যিনি তার জীবনের প্রায় সমগ্র অংশ জুড়েই নানাভাবে মানুষকে শিখিয়েছেন সিনিক দর্শনের মূল বিষয়গুলো।

তার সেই শিক্ষা এই একবিংশ শতাব্দীতেও অদ্ভুতভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। তার দর্শন এবং জ্ঞানের দিকে আলোকপাত করতেই আমাদের আজকের আয়োজন।
ডায়োজিনিসের সাথে একজন বিখ্যাত মানুষের নাম জড়িয়ে আছে, যার কথা আমরা প্রায় সকলেই জানি।

তিনি হলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। আলেকজান্ডার ডায়োজিনিস সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন তাতে বোধ হয় তার সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমাদের বহুগুণ বেড়ে যাবে! আলেকজান্ডার বলেছিলেন,
“আমি যদি আলেকজান্ডার না হতাম, তবে ডায়োজিনিস হতে চাইতাম!”

আমাদের আজকের আলোচনা আলেকজান্ডারের সাথে ডায়োজিনিসের কিছু ঘটনা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
গুণী মানুষের খুব কদর করতেন আলেকজান্ডার। প্রথমবার যখন তিনি শুনেছিলেন ডায়োজিনিসের কথা, ঠিক করলেন দেখা করবেন। চলে গেলেন ডায়োজিনিসের ঠিকানায়। দেখলেন ডায়োজিনিসের আবাস হলো পরিত্যাক্ত বিশাল একটি টব বা মদের ভাড়।

ডায়োজিনিসের সামনে গিয়ে আলেকজান্ডার বললেন, “আমি আলেকজান্ডার দি গ্রেট।”
ডায়োজিনিস বললেন, “আমি ডায়োজিনিস দি সিনিক।”
আলেকজান্ডার বললেন, “আপনি কি আমাকে ভয় পাচ্ছেন না?”
ডায়োজিনিস বললেন, “কেন কেন? তোমাকে ভয় পেতে যাবো কেন? ‍তুমি ভালো না খারাপ?”
আলেকজান্ডার বললেন, “অবশ্যই ভালো।”
ডায়োজিনিস বললেন, “তো ভালো জিনিসকে কেউ ভয় পায় বুঝি?”

প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হয়ে গেলেন আলেকজান্ডার। এরপর বারে বারে আসতেন তিনি ডায়োজিনিসের কাছে।
আরেকবার ডায়োজিনিস তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাপু, তোমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?”
আলেকজান্ডার বললেন, “সমস্ত গ্রীস নিজের আয়ত্তে আনা।”
– তারপর?
– সমস্ত এশিয়া মাইনর নিজের আয়ত্তে আনা।
– তারপর?
– সমস্ত পৃথিবী নিজের আয়ত্তে আনা।
নাছোড়বান্দা ডায়োজিনিস লেগে থাকেন, “তারপর?”
– তারপর আর কী! বাড়িতে বসে বসে বিশ্রাম নেবো!
ডায়োজিনিস তখন মিটিমিটি হাসেন, বললেন, “হে হে, সে কাজটি এখন করলেই তো পারো!”
অমনই একদিনে গুরুর জন্য কিছু করার ইচ্ছে হলো আলেকজান্ডারের। ডায়োজিনিস তখন তার ভাড়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ওহে ডায়োজিনিস, আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?”
ডায়োজিনিস শান্তভাবে বলেন, “তুমি আমার সামনে থেকে সরো তো বাপু! তোমার জন্য আমি রোদ পোহাতে পারছি না!”

এখানে খেয়াল রাখার বিষয়, বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকর্তা তখন আলেকজান্ডার। তো অমন ক্ষমতাবান একজন মানুষ নিজ থেকে এসে কিছু দিতে চাইলেন, কিন্তু তাকে সোজাসাপ্টা প্রত্যাখ্যান করলেন ডায়োজিনিস! কারণ তিনি দরিদ্র হলেও ছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বাধীন। প্রাচীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাজারও তাকে দেবার মতো কিছু নেই। কেননা, প্রকৃতি, এক্ষেত্রে রোদ ছাড়া তার সে মুহূর্তে আর কোনো প্রয়োজন ছিলো না। প্রজ্ঞা তো সেটাই, কী প্রয়োজন আর প্রয়োজন নয় তা জানা।

“তুমি আমার সামনে থেকে সরো তো বাপু! তোমার জন্য আমি রোদ পোহাতে পারছি না!”- আলেকজান্ডারকে ডায়োজিনিস;
অদ্ভুত একজন মানুষ ছিলেন ডায়োজিনিস। পোশাক পরতেন যৎসামান্য, থাকতেন রাস্তার ধারে একটা টবে। আমাদের দেশে ড্রেনের বড় পাইপের ভেতর যেমনটি থাকতে দেখা যায়, খানিকটা সেরকম। নিজের সম্পদ বলতে ছিলো শুধু একটা লাঠি, লণ্ঠন, পরনের সামান্য শতছিদ্র কাপড় আর একটা খাবার পাত্র। খেতেন ভিক্ষা করে। ভিক্ষা করার সময় বলতেন, “তুমি যদি অন্য কাউকে ভিক্ষা দিয়ে থাকো, তবে আমাকেও দাও। আর আজ অব্দি যদি কাউকে না দিয়ে থাকো, তবে আমাকে দিয়ে শুরু করো!”

মাঝে মধ্যে চুরি করতেন বা অন্য কারো জিনিস কেড়ে নিতেন! তাকে প্রশ্ন করা হলো, “আপনি তো প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে বসবাস করেন, তো মানুষের জিনিস কেড়ে নেন কেন?” ডায়োজিনিস বললেন, “আমি অহেতুক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে বসবাস করি। এ জগতের সমস্ত জিনিস হচ্ছে ঈশ্বরের। আর জ্ঞানীরা ঈশ্বরের বন্ধু। তাই এ জগতের সব কিছুতেই জ্ঞানীদের অধিকার আছে!”
ডায়োজিনিসের জীবনের কিছু ঘটনা।

তাকে চিনবার জন্য আমরা আরো কিছু ক্ষুদ্র অথচ গভীর ঘটনার উপর আলোকপাত করতে পারি এবং এসব ঘটনাতেও তার প্রজ্ঞা, নির্মোহ জীবনযাপন, অপ্রথাগত চিন্তাধারার প্রকাশ পাবে। আমাদের বাস্তব জীবনাচরণে তা গুরুত্বপূর্ণ দিশা হয়ে থাকতে পারে।

১.
নিজ শহর সিনোপ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন ডায়োজিনিস। কিন্তু এর জন্য কখনও আক্ষেপ করেননি তিনি। বলেছিলেন, “নির্বাসনই আমাকে দার্শনিক বানিয়েছে। ” তাকে দাস হিসেবে বিক্রির জন্য নিলাম তোলা হয়েছিলো। কথিত আছে তখন তিনি বলেছিলেন, “আমাকে এমন কারো কাছে বিক্রি করো যার মনিবের প্রয়োজন।”

২.
একবার দেখা গেল, তিনি এক মূর্তির সামনে দাড়িয়ে সেটির কাছ থেকে ভিক্ষা চাইছেন। লোকে জিজ্ঞেস করলো, “কী ব্যাপার?” ডায়োজিনিস বললেন, “প্রত্যাখ্যাত হবার অনুশীলন করছি!”
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় দুটি। সে সময়কার প্রায় সকলেই মূর্তি পূজা করতো। তিনি তার বিরোধী ছিলেন। তিনি লোকদের বোঝাচ্ছিলেন, তাদের ঈশ্বর উনার সামান্য প্রয়োজনও কখনও পূরণ করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, দর্শন কিংবা প্রাচীন দার্শনিকগণ সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করেন না, তারা শুধুমাত্র মানুষের তৈরি ভ্রান্ত ধারণাগুলোর বিরোধীতা করেন।

৩.
ডায়োজিনিসকে প্রায়শই কুকুর বলে ডাকা হতো। এমন ডাকনাম অবশ্য তিনি পছন্দ করতেন! তিনি বলতেন, “অন্য কুকুররা তাদের শত্রুদের কামড়ায় আর আমি আমার বন্ধুদের কামড়াই, তাদের রক্ষা করতে।”

৪.
ডায়োজিনিসের বাবা সিনোপ শহরে মুদ্রা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। ডায়োজিনিস সেসব মুদ্রার খোদাই নষ্ট করতেন। সিনিক আন্দোলনে এটি একটি প্রতীকি রূপ পেয়েছিলো। সিনিকেরা মুদ্রা নষ্ট করার মাধ্যমে সামাজিক প্রথাকে আক্রমণ করেন।

৫.
একবার দিনের বেলা তিনি লণ্ঠন হাতে বাজারে উপস্থিত হলেন। দিনের বেলা বুড়োর হাতে জ্বালানো লণ্ঠন দেখে সবাই বেশ আমোদ পেলো। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই ভরদুপুরে লণ্ঠন হাতে কোথায় চললেন?” ডায়োজিনিস বললেন, “আমি আসলে মানুষ খুঁজছি। গ্রীসের কোথায় মানুষ পাওয়া যাবে, কেউ বলতে পারবে?”
স্বদেশী গ্রিকদের তিনি কেন এতো বেশি ঘৃণা করতেন যে, তাদের মানুষ বলেই গণ্য করতেন না? কারণ তিনি ভাবতেন, তারা দরিদ্রতাকে আপন করে নেয়নি। তাই তারা দারিদ্র্যের সাথে জড়িয়ে থাকা স্বনির্ভরতা এবং নির্মল স্বাধীনতাকে উপভোগ করতে পারে না; তারা অপূর্ণ থেকে যাবে আমৃত্যু!


সামাজিক প্রথাকে তিনি আরো অনেকভাবে আক্রমণ করতে উদ্যত হন। একবার এক থিয়েটার শেষে সবাই যখন বের হয়ে যাচ্ছিলো, তখন দেখা গেলো ডায়োজিনিস প্রবেশ করছেন। কেউ বললো, “এখন এসেছেন কেন? থিয়েটার তো শেষ!” ডায়োজিনিস বললেন, “তোমাদের প্রথাকে আক্রমণ করতে এসেছি।” এই বলে তিনি শূন্য থিয়েটারের ভেতরে গিয়ে বসে রইলেন!


ডায়োজিনিস একবার দর্শনের নানা বিষয় কিছু মানুষের সামনে আলোচনা করছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন, মানুষেরা ধীরে ধীরে কেটে পড়ছে এবং নিজেদের কাজে মনোযোগী হয়ে যাচ্ছে। তিনি হঠাৎ তার আলোচনা থামিয়ে নাচতে আরম্ভ করলেন। অমনি আবার সবাই তাকে ঘিরে ধরলো। তিনি নাচ থামিয়ে বললেন, “বুরবকের দল! ভালো কথায় আগ্রহ নেই, ভাঁড়ামিতে ঠিকই আগ্রহ!”


দর্শনের এক ছাত্র একবার ডায়োজিনিসের কাছে এসে বললো, “দর্শনবিদ্যা আমার কাছে খুব কঠিন মনে হয়।” শুনে ডায়োজিনিস বললেন, “ভালোভাবে বাঁচতে চাও না যখন, বেঁচে আছো কেন?”


ডায়োজিনিসকে জিজ্ঞেস করা হলো, বিয়ের জন্য সঠিক বয়স কোনটি? ডায়োজিনিস বললেন, “একজন যুবকের জন্য এখনও আসেনি, আর বুড়োর জন্য পেরিয়ে গেছে!”

১০
ডায়োজিনিসের কোনো বিলাস দ্রব্য ছিলো না। তিনি একটি পাত্রে পানি পান করতেন। একদিন তিনি এক শিশুকে দেখলেন, জলাধার থেকে হাত দিয়ে পানি উঠিয়ে পান করতে। তখন তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “হায়! একটি শিশু সাধারণ জীবন যাপনে আমাকে হারিয়ে দিলো!” বলেই তিনি তার পাত্রটিকে ছুড়ে ফেলে দেন।

১১
মৃত্যু আগে তিনি বলে গিয়েছিলেন, “আমার মৃত্যু হলে তোমরা আমার শরীরটাকে শহর থেকে দূরে ফেলে রেখে এসো, জন্তু জানোয়াররা যেন তা খেতে পায়।”
ডায়োজিনিসের অমূল্য বাণী
একজন জ্ঞানীকে আবিষ্কার করতে আরেকজন জ্ঞানীর প্রয়োজন হয়।
তারই সবচেয়ে বেশি আছে, যে অল্পে তুষ্ট।
কুকুর এবং দার্শনিকেরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করে থাকে, কিন্তু সবচেয়ে কম প্রতিদান পায়।
রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে তার যুবসমাজের শিক্ষা।

ছাত্র খারাপ আচরণ করলে তার শিক্ষককে চাবকানো হবে না কেন?
ঈশ্বর হবার সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হলো তার কারো কাছে হাত পাতা লাগে না। যারা ঈশ্বরের খুব কাছাকাছি, তাদের প্রয়োজন তাই খুব সামান্য।

একজন ধনীর বাড়িতে থুতু ফেলবার কোনো জায়গাই থাকে না, তার চেহারা ছাড়া!
ডায়োজিনিসের জীবনী সম্বন্ধে আমাদের বেশি কিছু জানা নেই। তবে তিনি জন্মেছিলেন সিনোপে, কৃষ্ণ সাগরের তীরে অবস্থিত শহরটিতে। রাফায়েলের স্কুল অফ এথেন্সে আমরা তাকে দেখি ছন্নছাড়াভাবে সিঁড়ির উপর বসে থাকতে।

ডায়োজিনিস বা অন্য সিনিক চিন্তকেরা মূলত মানুষের জীবনের দুটি সমস্যার সমাধানের শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তা হলো, ১. Ataraxia এবং ২. Apatheia। গ্রীক ভাষায় Ataraxia অর্থ সব ধরনের উদ্বেগ এবং চিন্তা থেকে মুক্তি, এক শক্তিশালী স্থিরতা। অন্য দিকে Apatheia অর্থ মনের সেই অবস্থা, যাকে তীব্রতম আবেগও বিচলিত করতে পারে না। সে অবস্থা নির্বিকার নয়, বরং চিন্তাশক্তির স্থিরতায় বিজারমান প্রশান্তি।

সিনিকগণ বলতেন, আমাদের শুধুমাত্র অবশ্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে প্রকৃতির নিয়মে বাঁচা উচিৎ। এমনকি তারা গাছ থেকে ফল না পেড়ে সামান্য পরিমাণ ডাল খেয়ে বেঁচে থাকতেন। পরনের সামান্য কাপড় আর লাঠি বা চামড়ার থলে ছাড়া তাদের ভিন্ন কোনো সম্পদ থাকতো না। তারা বাস করতেন প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা কোনো আবাসে, তাদের মালিকানায় কোনো আরামদায়ক আবাসও ছিলো না। তারা বলতেন, এমন জীবনধারণই চরম প্রশান্তি এনে দিতে পারে।

সুত্রঃ পেইজ philosophy